বিদ্যাস্থানে ভয়ে বাঁচা
আমার বাবাও শিক্ষক ছিলেন। বাঙলা সাহিত্যের। বাবার জনপ্রিয়তা দেখে ঐ কৈশোর বেলাতেই মোটামুটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছিল। আজ এতো দূর এসে দেখছি, ভুল সিদ্ধান্ত নিই নি। নতুন প্রজন্মের সঙ্গ পাওয়া, তাদের থেকে শেখার সুযোগ না পেলে হাজার পড়াশুনো সত্বেও জেনারেশন গ্যাপ সবই অকেজো করে দিত। অনেক তাড়াতাড়িই বুড়ো হয়ে যেতাম। পরপ্রজন্মের থেকে বহু বহু দূরে সরে যেতে হতো। বাঁচার উৎসাহটাই মরে যেত। এবং সর্বোপরি অনেক মজার ঘটনার সঙ্গে পরিচিতি ঘটতো না। এই সব টুকরোটাকরা স্মৃতির স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকতাম। বাবার সঙ্গে থেকে কিছু ঘটনার সাক্ষি আমি। আবার কিছু কিছু আমার নিজের। বলে রাখা ভাল, চরিত্রের নামগুলো পালটানো জরুরি। কাউকে আঘাত করার বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য না থাকলেও, সে বিড়ম্বনার ঝুঁকি না নেওয়াটাই তো শ্রেয়ঃ।
তখন আমি নেহাৎই ছোট। বাবা যখন পরীক্ষার খাতা দেখতেন, আমি পাশে বসে থাকতাম। বাবাও কিছু মজার দেখলেই আমার সঙ্গে শেয়ার করতেন। এমনকি কখনও কখনও মাকে ডেকেও শোনাতেন।
তখন গরমকাল। এক ছুটির দিনে দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর বাবা স্কুলের ষাণ্মাসিক পরীক্ষার খাতা দেখছেন। আমি পাশে একটা বই নিয়ে পড়ছি। হঠাৎ বাবার মৃদু চিৎকারে তাকিয়ে দেখি বাবা একটা খাতার দিকে তাকিয়ে বেদম হাসছেন। বাবা ঠিক ওরকম ভাবে হাসার লোক নন। অবাক হলাম। আমার কৌতূহলি ত্রস্ত মুখ দেখে বাবা থামলেন একটু অপ্রস্তুত হয়েই। একটু সাফাইএর ভঙ্গিতেই যেন বলে উঠলেন, এরা যে কী সব অদ্ভুত কথা লেখে মাঝে মধ্যে, না হেসে থাকতে পারিনা। ব্যাপারটা হল, প্রশ্নপত্রে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের উপর একটি রচনা লিখতে বলা হয়েছে। এক পরীক্ষার্থী তার সমস্ত সৃজনশীলতা ঐ রচনাতে ঢেলে দিয়েছে। শুরুই করেছে এক বোমা ফাটিয়ে। ভয়ঙ্কর ভাবেই। যা লিখেছে, এতদিন বাদেও বেশ মনে আছে। বিদ্যাসাগর একজন মহামানব ছিলেন। তিনি এতটাই প্রতিভাবান ছিলেন যে অত্যন্ত কম বয়সে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। আমি অনেক ছোট ক্লাসে পড়লেও এই অদ্ভুত লিখন-এ হতবাক। তখনও oxymoron শব্দটা আমার অভিধানে আসে নি। তারপরেই দেখালেন রচনার উপসংহার। সেটি ছিল আবার ছন্দোবদ্ধ প্রয়াস
সব শেষে বিদ্যাসাগরের প্রতি একটি স্বরচিত কবিতা দিয়ে আমি শ্রদ্ধাঞ্জলি দেবঃ
বিদ্যাসাগরের কথা যে ব্যাটা মনে নাহি রাখে
সবংশে নির্বংশ হয়ে তারে খাউক বাঘে!
অলমতি বিস্তারেণ। ব্যাটা ছাড়া আর কোন স্ল্যাং ও নেই। একেবারে ঘনীভূত শ্রদ্ধা! বিদ্যাসাগরে প্রতিক্রিয়া তো জানার উপায় ছিল না। আজকের সময়ে বিদ্যাসাগরের কথা কম লোকই বোধ করি মনে রাখে বা রেখেছে। তবে বাঘের এই রূপ প্রতিশোধের ব্যাপারটা ঘটেছে বলে শুনিনি। বহু আগেই বাঘ শিকারিরা বরং বাঘেদেরই প্রায় নির্বংশ করে ফেলেছেন। উপরন্তু বিদ্যাসাগর যে বাঘ পুষতেন বা বাঘেরা বিদ্যাসাগরের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছিলো তারও কোন প্রামাণ্য ইতিহাস নেই। তবে রচনার লেখক ছাত্রটির বিদ্যাসাগরের প্রতি খুব সহিংস শ্রদ্ধা ছিল, সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই।
এর পরের কাহিনিটিও এক ছাত্রকে নিয়েই। সে ছিল আমাদের স্কুলের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ফুটবলার। স্কুল কেন, সারা এলাকাতেই তার ভাল খেলোয়াড় বলে নামডাক। বিশেষত হেড দিয়ে গোল করার। সে অর্থে সে ছিল সকলের প্রিয়। ছেলেটির টেম্পারামেন্টও ছিল খুব ভাল। মিশুকে এবং সফট স্পোকেন বলা যেতেই পারে। তবে এখন সন্দেহ হয়, খুব বেশি হেড করে করে ওর কিছু অন্যান্য ব্যাপারে বুদ্ধি হ্রাস পেয়েছিল। বিশেষ করে পড়াশুনোয়।
একদিন দেখি স্কুলে সে আমার বাবার পিছে পিছে ঘুরঘুর করছে। হ্যাঁ, আমি বাবার স্কুলেই পড়তাম। সম্ভবত তখন ক্লাস সেভেন। ক্লাসরুম টা ছিল টিচার্স রুমের প্রায় লাগোয়া। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফিস ও হেড মাস্টারমশাইয়ের ঘর তার ঠিক উল্টো দিকে। হরদম মাস্টারমশাইরা দুদিকেই চলাফেরা করতেন। ফলে ঐ ছোট্ট অঞ্চলটা ছাত্রদের পক্ষে একটু ভয়েরই। আমি জানলার ধারে বসে দেখছিলাম ঐ ছেলেটি, ধরা যাক নাম রতন, বেশ কয়েকবার আমার বাবার পিছুপিছু কি একটা বলতে বলতে চলেছে। শেষ পর্যন্ত দেখলাম বাবা এক বান্ডিল পরীক্ষার খাতা ও রতন কে নিয়ে হেডমাস্টারমশাইয়ের কামরায় ঢুকলেন। এবং খানিক বাদেই রতন খুব বিমর্ষ হয়ে বেরিয়ে এলো। ব্যাস।
সন্ধেবেলায় ঘটনাটা শুনলাম। বাবার কাছেই। রতন তখন ক্লাস টেন-এ। বাবা ওদের বাঙলা পড়াতেন। পরীক্ষায় বাঙলা সেকন্ড পেপারে একশো তে ৫ পেয়েছে। হতাশ ও ক্ষুব্ধ রতন বাবার উপর চড়াও হয়েছে। তো বাবা একেবারেই কোন ঝুঁকি না নিয়ে সোজা রতন ও ওর খাতা নিয়ে হেডমাস্টারমশাইয়ের সামনেই ওর খাতা খুলে ওকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। রতন শুধুমাত্র রচনা লেখা ছাড়া আর কোন প্রশ্নের উত্তর দেয় নি। রচনার বিষয়বস্তু ছিল, বাবা মায়ের প্রতি সন্তানের কর্তব্য। রতন মূল খাতা ও বেশ কিছু অতিরিক্ত কাগজ নিয়ে মাতাপিতার প্রতি তাঁর কর্তব্যের কথা লিখে গেছে। এবং প্রায় একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখে গেছে। মাতা পিতা আমাদের দেবতার মতো। তাঁদের প্রতি আমাদের অনেক কর্তব্য। সেই কর্তব্য আমাদের পালন করতে হবে। মানে যা লিখেছে তার শুদ্ধ সারমর্ম করলে এই দাঁড়ায়। কিন্তু রতন এই লেখাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছে এটায় তাঁর পুরো মার্কসই পাওয়া উচিত। বাবা কেন হেড মাস্টারমশাই-ও বহু চেষ্টায় ওকে বোঝাতে পারেন নি। তাই বিমর্ষ হয়ে বেরিয়ে এসেছে। শিক্ষক দুজনের রতন সম্পর্কে প্রভূত সমবেদনা থাকলেও, কিছু করা সম্ভব হয় নি। হেড মাস্টারমশাই নাকি বলেছেন, আরে তোকে তো তবু ৫ নম্বর দেওয়া হয়েছে, আমি হলে নিরেট শূন্য দিতাম। এটায় রতন খুবই দাগা পেয়েছে। ও যাওয়ার পরে হেডমাস্টারমশাই নাকি রসিকতা করেছেন, এটা কিন্তু আপনার ঠিক হয় নি; বেচারা এতবার এক কথা লিখলেও, বাবামায়ের প্রতি যে ওর কর্তব্য বোধে যে ভেজাল নেই, এটা কিন্তু মানতে হবে! পরে শুনেছি, রতন খেলার কোটায় পুলিশে কাজ পেয়েছে। এবং একদিন ও বাবাকে প্রণাম করেও গেছে। আজকে অনুরূপ ঘটনার পরিণতি ঠিক কী হতো, অনিশ্চিত। কারণ রতন কাণ্ডের কিছুদিন আগেই ক্লাস ইলেভেন-এর এক পরীক্ষার্থী নকল করার সময় বাবার কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ায়, বেরিয়ে দোতলার ঐ নির্দিষ্ট ক্লাস রুমে বোমা ছুঁড়েছিল। সে অবশ্যি সে সময়ের ক্ষমতাশীল দলের এক পোষা গুন্ডাই ছিল।
প্রসঙ্গক্রমে, আমার নিজের শিক্ষক জীবনের দুটি ঘটনা মনে পড়ে গেলো। মাস্টার্স ক্লাসে দুটো বিষয় ভাগ করে পড়াতাম, ফার্স্ট ইয়ারে জেনারেল ম্যানেজমেন্ট ফার্স্ট হাফ আর সেকন্ড ইয়ারে ফিনানশিয়াল ম্যানেজমেন্ট সেকন্ড হাফ। সে সময়ে প্রতি পেপার এ’রকম ভাবেই ভাগ করা হতো। দুটোর সঙ্গেই দুর্ঘটনা জড়িত।
ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেছে। একদিন ডিপার্টমেন্টে-এ ঢুকছি, একটি ছেলে এগিয়ে এসে বাও করে জিজ্ঞেস করলো, স্যার, খাতা দেখা হয়ে গেছে? কোন পেপার? জানলাম ও ফার্স্ট ইয়ারের। সুতরাং জেনারেল ম্যনেজমেন্টের কথা বলছে। এসব কৌতূহল একটু বিপজ্জনক। বলে দিলাম, না। যদিও আমার খাতা দেখা হয়ে গেছে। ও আমাকে নাম ও রোল নম্বর বলে দিলো।
বাড়ি ফিরে ছেলেটির কথা মনে পড়লো। কারণ ছিল। ঐ ছেলেটি কোনদিনই আমার ক্লাস কামাই করে নি। একদম সামনের সারিতেই বসত। খাওয়াদাওয়ার পর নেহাত কৌতূহল বশতই খাতার বান্ডিল টা খুলে ওর খাতাটা নিলাম। কিন্তু এ কী! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। ছেলেটি পঞ্চাশে শূন্য পেয়েছে! অসম্ভব। এতো সিরিয়াস ছাত্র, প্রতিদিন ক্লাস করেছে। এ আমি কী করেছি! নিজেকে খুব অপরাধী মনে হোল! এ কেমন বিচার আমি করেছি! ওর সঙ্গে আজ যদি ঘটনাচক্রে দেখা না হতো! আর ভাবতে পারলাম না। ওর আন্সার শীট টা নিয়ে পড়ার টেবলে বসলাম। সব খাতা আবার দেখতে হবে। আগে তো ওরটা দেখি! আজ রাতে আর ঘুমনো যাবে না!
খুব মনোযোগ দিয়ে ঘণ্টা দেড়েক ধরে আগাপাশতলা দেখলাম। এবং সব কটা উত্তর পড়ার পর জিরোই দিলাম! যা লিখেছে তাতে এর বেশি ওর প্রাপ্য নয়। তবুও, কাল একবার ইউনিভারসিটি লাইব্রেরিতে গিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে। কারণ ছেলেটি যে সব গপ্পো লিখেছে, এমন বিশ্বাসযোগ্য ভাবে লিখেছে যে, কোন চান্স নেওয়া ঠিক নয়। শুয়ে পড়লাম।
তারপরদিন লাইব্রেরি ঘেঁটে, বাড়ি ফিরে, আবার শূন্যই দিতে হোল! ওহ, কী ভয়ানক অভিজ্ঞতা! তবে, এ ছাত্রের থেকে আপাতত দূরেই থাকতে হবে!
দ্বিতীয় ঘটনাটা আরও মারাত্মক।
সেটা ফিনান্স পেপার নিয়ে। পরীক্ষা, খাতা দেখা মায় রেজাল্ট বেরোনো সব শেষ। হঠাৎ একদিন বিভাগীয় প্রধান ও ফ্যাকাল্টি ডীন তলব করলেন। জানলাম পরীক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ একজন কেউকেটা ছিলেন। এক বিখ্যাত অডিট ফার্মের এক উচ্চ পদাধিকারী। তিনি এক অভিজ্ঞ চার্টার্ড ডাইরেক্টর। একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টান্ট-ও বটেন। আমার হাতে পঞ্চাশে মাত্র ছয় পেয়েছেন। পেপার রেভিউ-এর আবেদন করেছেন এবং হেড ও ডীন দুজনের সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ জানিয়ে গেছেন। উপর মহল থেকে চাপ আসছে। অভিযোগ ইভ্যালুয়েশন ঠিক মতো হয় নি। লক্ষ্য করলাম ওঁদের দুজনেরই সহানুভূতি পরীক্ষার্থীর দিকে। আমি তখন প্রায় সদ্য নিযুক্ত হওয়া লেকচারার। কোন গড়বর করে ফেলেছি! আমাকে জিজ্ঞেস করা হোল, একজন অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অধ্যাপককে দিয়ে যদি ব্লাইন্ড রিভ্যু করানো হয়, আমার সম্মতি আছে কিনা। এই কথোপকথনের অভিঘাতেই আমি যথেষ্ট কেঁপে গেছি! আর আমার অন্য অপশনই বা কোথায়! সম্মতি তো দিতেই হবে। সেই মুহূর্ত থেকে আমার কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেলো। আমিও বিশ্বাস করতে শুরু করলাম, আমি নিশ্চয়ই কিছু ভুল করেছি। কারণ ফাইনান্সের ওরকম ওজনদার লোক কখনও এতো কম স্কোর করতে পরে! এবার বোধ হয় আর বাঁচা গেলো না। পরের প্রায় দু’হপ্তা যে কীরকম ভাবে কাটল আমিই জানি। আর এ কথা তো কারও সাথেই শেয়ার করা যায় না। ফ্যাকাল্টি রুমে গেলে মনে হয় যেন আমায় দুয়ো দিচ্ছি। সবাই যেন জেনে গেছে আমি একটি বিপদ ঘটিয়েছি! বাড়িতেও চুপচাপ থাকি। যা হোক একদিন সেরকম এক তলবই এলো। আমার তো প্রায় হাঁটু কাঁপছে। গেলাম। দেখলাম দুজনেরই একটু হাসিহাসি মুখ। বিভাগীয় প্রধান শুরু করলেন। উনি আমার শিক্ষকও ছিলেন। ভয় নেই। রিপোর্ট এসে গেছে। ইভ্যালুএশন-এ কোন ভুল ছিল না। সে যে আমার কী অসাধারণ অনুভূতি। নতুন জীবন পেলাম। আরও শুনলাম, রিভ্যুয়ারের দেওয়া নম্বর ছয়ের থেকেও কম। দুজনেই আমাকে বসালেম, চায়ের অর্ডার দিলেন। তবে আমি একটু অবাকও হয়েছি। অমন এক সফল পেশাদার ফিনান্স এক্সপারট-এর এহেন পারফরমান্স কেন? আমিও এই জিজ্ঞাসাটাই রাখলাম। ওঁরা বললেন, এরকম পেশাদারেরা একটু ওভারকনফিডেন্ট হন। পড়াশোনা নয়, নিজের পেশাদারি জ্ঞানের উপরেই বেশি নির্ভর করেন। পেশাদারদের জ্ঞান একটি ছোট ক্ষেত্রেই থাকে। খুব স্পেসিফিক; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস তো ব্যাপকপতর। হয় তো তাই হবে। আমার দ্বিধা রয়ে গেলো। অবশ্য, পরবর্তীকালে একটি লেখা ওঁদের পর্যবেক্ষণকে মান্যতা দিয়েছে আমার কাছে। দেশের চারটি অগ্রগণ্য আই আই এম-এর ডাইরেক্টরদের একটি রাউন্ড টেবল হয় কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের সফল ব্যক্তিরা আই আই এমে শিক্ষকতার কাজে কতোটা উপযোগী এই বিষয়ের উপর। ঐ আলোচনার টেক্সট টা এক আই আই এমের জার্নালেই প্রকাশিত হয়। সম্ভবত আই আই এম ব্যাঙ্গালোরের। তাঁদের সমবেত আলোচনা থেকে যেটা উঠে আসে তা হোল, সফল পেশাদারদের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অতিথি-অধ্যাপক হিসেবে আমন্ত্রণ জানান যেতে পারে; তবে কখনই পুরো কোর্স পড়ানোর জন্যে নয়। আমার দ্বিধাও অনেকটাই কাটলো।
এসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে ভারতীয় শিক্ষা জগৎটার একটি বৈশিষ্ট্যও নজরে আসে। কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড আর অ্যাকাডেমিয়ার মধ্যে একটা ব্যবধান রয়েই গেছে। হাজার সেমিনারেও তা কাটে নি। বিদেশে পড়াতে গিয়ে এই রকমের কোন অভিজ্ঞতাও হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা ফলিত বাণিজ্যের ঘরে অছ্যুত নন। এবং কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞ মাথারা শিক্ষাঙ্গনে সমান সমাদৃত। এ নিয়ে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে একটি আলাপচারিতা মনে পড়ছে। ২০০৯-১০। ওখানে এক সিনিওর প্রফেসরের সঙ্গে ম্যানেজমেন্ট শিক্ষায় industry-academia interaction নিয়ে আলোচনা কালে, ওঁর একটি মন্তব্য আমার এখনও মনে আছে, Indian business world isn’t enough academized! চিত্র যে বিশেষ বদলায় নি কিছুদিন এটা বলার জন্যে কোন গবেষণার দরকার নেই!
আলোচনাটা একটু বোধ হয় ভারি হয়ে যাচ্ছে।
একটু লঘু গপ্পো হয়ে যাক। অবশ্য এগুলো তো বানানো গল্প নয়। শুরুতেই বলে রেখেছি মূল ঘটনাগুলো সত্যি।
বাবা বোর্ডের পরীক্ষকও ছিলেন। সেখানেও বহু মজার ঘটনা স্মৃতি আছে। একটা বৃহত্তর ছাত্রমানসের আভাস পাওয়া যায়।
তখন বাঙলা টেক্সট-এ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শকুন্তলার পতি গৃহে যাত্রা ছিল পাঠ্য। শকুন্তলা ও দুষ্যন্তের গল্পটা আমাদের সকলেরই জানা। একবার বোর্ডের পরীক্ষায় সেখান থেকে প্রশ্ন এসেছিল। বাবা এক রবিবারের দুপুরে খাতা দেখছেন। হঠাৎই বাবার আর্তনাদ শুনলাম। বাবা মাথা নাড়ছেন আর যন্ত্রণাবিদ্ধ স্বরে বলে চলেছেন, অসম্ভব, সিমপ্লি ইম্পসিবল; আমি এবারে পাগল হয়ে যাব। সারা পরিবারটাই জেগে উঠলো। সবাই প্রায় হতবুদ্ধি হয়ে উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাথমিক উত্তেজনাটা কেটে গেছে কারণ বাবার কোন আকস্মিক অসুস্থতা হয় নি। বাবা একটু অসহায় কাশি দিয়ে শুরু করলেন, দেখো, কী সব লিখেছে! ভুলভাল তো ঠিক আছে! কিন্তু এ যা লিখেছে, তাতো উচ্চারণ করা যায় না! আমি তোমাদের পড়ে শোনাতেও পারব না! এতো রাস্তার ভাষা! এমন সাহস এরা পায় কী করে! কোথায় গেছে দেশটা! আজকের সময়ে বাবার প্রতিক্রিয়াটা কেমন হতো অনুমান করতে পারি! এবার আর সকলেই যে যার দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রাস্থলে সরে পড়লো। আমি বাবার কাছাকাছিই থাকলাম। আমি দুপুরে ঘুমাতাম না। তবে সে অশ্লীল উত্তর তখন দেখতে পারিনি। অবশ্য কদিন বাদে চুপিচুপি সে খাতা আমি দেখেছি। তখন তো মোবাইল ফোন ছিল না। নতুবা ছবি তুলে রাখতাম। আজ স্মৃতি থেকে লিখছি। এরকমই ছিলঃ শকুন্তলা খুব হারামি ছিল। কণ্ব মুনি ওকে রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়ে কতো কষ্ট করে বড় করলো; আর ও এদিকে কণ্বকে ধোকা দিয়ে রাজা দুষ্যন্তের সঙ্গে কেটে পড়লো! এক নম্বরের বেইমান।
হ্যাঁ, রাস্তার ভাষা তো বটেই, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু শকুন্তলার চরিত্র বিশ্লেষণে এই ওরিজিনালিটি আজ পর্যন্ত আর কেউ দেখাতে পেরেছে কিনা জানা নেই!
যাপন-নামা (পর্ব ৬)
▮ মণিপদ্ম দত্ত
▮ মণিপদ্ম দত্ত




মন্তব্য