আত্ম-পরিচয়ের বিপদ
ঘটনাকাল ১৯৯১। ফিরছি মাইশোর থেকে। মাইশোর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আমন্ত্রণ ছিল। দিল্লিতে ট্রেন বদল। রাজধানী থ্রি টিয়ার। এখানে এতদিন বাদে নিজের পুরনো একটি অপরাধের কথ কবুল ক’রে নেওয়া যাক। উদ্যোক্তারা এসি ফার্স্ট ক্লাসের পয়সাই দিয়েছিলেন, তবে ফেরার সময় দিল্লি-হাওড়া টিকিট টা থ্রি টিয়ারে কেটেছিলাম। বনেদি গরীব তো। সামান্য পয়সা বাঁচানো, এই আর কি! অবশ্য ট্রেনের একটি ঘটনাই আমাকে এই নিম্নবিত্ত ছ্যাঁচড়ামি থেকে চিরদিনের মতো মুক্ত করেছে। গল্প সেটাই।
ট্রেন যথারীতি ছাড়ল। সাইড বার্থের একটি আমার। আর একটি মোটামুটি সম বয়েসি আর এক বাঙালি যুবকের। পরিচয়ের পর জানা গেলো, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক। দিল্লিতে কনফারেস এ এসেছিলেন। মনে হোল সেম কেস। পয়সা বাঁচানোর। চেপে গেলাম। কাক তো কাকের মাংস খায় না। একটু বলও পেলাম। যাই হোক, আমি একা নই। মনের ভার খানিকটা লাঘব হোল তো বটেই। গৌরবে কেন অগৌরবেও বহুবচন হলে সুবিধেই তো হয়। বিবেক দংশন কমে। আর বাঙালি হলে বিবেক তো থাকবেই। এক মারোয়াড়ি ব্যবসায়ি ভদ্রলকের কথা মনে পড়ে গেল। কোন এক আলাপচারিতায় বলেছিলেন, মোশাই, বাঙালির বিবেক আছে। আর বিবেক শালা হারামি আছে! তাই তো আপনারা কিস্যু করতে পারেন না! মোক্ষম অবজারভেশন। সত্যিই তো। কীই বা করতে পেরেছি। দুপয়সা বাঁচিয়ে অপরাধবোধে ভুগছি। এটা প্রায় সর্বজনবিদিত, আমরা একটু ঝুঁকি এড়ানো জাত। আবার দুধু ও তামাকু দুটিতেই সমান আসক্তি। চিরন্তন এথিকাল সমস্যা। গানই রয়েছে, আমার যেমন বেণী তেমনি রবে…। আধুনিক কবিতায়ও। ‘ধর্মে আছি, জিরাফেও আছি’।
ভালই কাটছিল সময়। আর, রাজধানিতে তো পরদিন সকালেই পৌছনো। পাশের ছ’ বার্থের কিউবিক্যুলেও দেখলাম একটি বাঙালি ফামিলি । দুটি চঞ্চল বাচ্চাও রয়েছে। বেণী দোলানো বছর আটেকের এক মেয়ে, সঙ্গে তাঁর বিচ্ছু ভাই। বছর পাঁচেকের। দুজনেরই লাফালাফি বিরামহীন। পাশে মোটামুটি মধ্য তিরিশের বাবা মা। কথা শুনে বোঝা গেল বাঙ্গালি, তবে ওপার বাঙলার। ধীরে ধীরে আলাপ জমে গেল পুরো পরিবারটার সঙ্গে। একেতে বাংলাদেশি, তারপর দুটি দুরন্ত শিশু, আলাপ জমতে আর কতক্ষণ! তখনও আমি বাংলাদেশ যাইনি। বাঙালিদের জন্যে একটা গোটা দেশের ব্যাপারটা আমাকে কৈশোর থেকেই আপ্লুত করে রেখেছিলো। এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলাম না। আড্ডা বেশ জমে উঠল। খানিকটা চকোলেট আদান প্রদান। ভদ্রলোক ঢাকাবাসি। কোন একটি বাংলা খবরের কাগজে চাকরি করেন। চাকরি করেন তাঁর স্ত্রীও। একটি মেয়েদের ম্যাগাজিনে। আমাদের সানন্দার মতোই। বেশ রংচঙে। বললেন উনিই এডিটর। এক কপি দেখতে দিলেন। নেড়েচেড়ে দেখলাম। দেখারই কাগজ। বাচ্চা দুটো আমাদের ন্যাওটা হয়ে গেল। তবে রাজধানী এক্সপ্রেসে তো আর হকার থাকে না। আমাদের ডিনারে দেওয়া আইস্ক্রিম দুটো দিয়ে কাজ সারতে হোল। যদিও ওদের বাবামা দুজনেই তুমুল আপত্তি করেছিলেন। ভদ্রলোক বেশি আলাপি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক খবর টবর টুকটাক দিচ্ছিলেন। তবে ওঁর স্ত্রী ঠিক স্বাভাবিক হতে পারছিলেন না। আফটার অল আমরা দুজন কম বয়েসী যুবা। ওঁর আড়ষ্ট লাগতেই পারে। আড্ডাটা অবশ্য ভালই হোল। ঢাকা গেলে বাড়িতে যেতে বললেন। ভিজিটিং কার্ডও দিলেন। রাত প্রায় নটার পর গপ্পগাছা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে চা জলখাবার এক সঙ্গেই। কিন্তু কোথায় দেখলাম সুরটা একটু কাটা লাগছে। আমি বেশি পাত্তা দিলাম না। পথের পরিচয়। আর হাওড়া আসতেও বেশি দেরি নেই। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম।
সবাই হাওড়ার অপেক্ষায়।
হঠাৎই খেয়াল করলাম, ভদ্রমহিলা যেন কিছু বলতে চাইছেন। আমাদের দুজনকেই। বললেন, ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? মানে, যদি কিছু মনে না করেন। ইতিমধ্যে তাঁর স্বামীটিও যোগ দিয়েছেন। এবার তিনিই স্ত্রীর মুখ থেকে কথাটা কেড়ে নিয়ে বললেন, আপনারা সত্যিই কি য়ুনভারসিটির (ওঁর উচ্চারণে) প্রোফেসর? আমরা একটু স্বভাবতই অপ্রস্তুত। এ আবার কেমন অদ্ভুত প্রশ্ন! উত্তর দিলাম, না প্রফেসর নই, কিন্তু ইউনিভারসিটিতে পড়াই। প্রফেসর হতে দেরি আছে। শালীনতা বজায় রেখে, একটু রুষ্ট গলায় বিস্ময় প্রকাশ করলাম, তা হঠাৎ এমন প্রশ্ন? ভদ্রলোক এবার সত্যিই খুব লজ্জায় পড়লেন! ভারি ইতস্তত করে বললেন, না, মান, বাংলাদেশেই কোন য়ুনভারসিটি প্রোফেসর তো থার্ড ক্লাসে জার্নি করে না! এটা তো ইন্ডিয়া, কত্তো বেশি ডেভলপড। তাই, আর কী!
আমরা তো কী বলে, কিংকর্তব্যবিমূঢ়! এরপরে আর কথা চলে না।
ট্রেন শিগগির ই হাওড়া পৌঁছল।
এই ঘটনার পর থেকে, ট্রেনে একটু নিচু ক্লাসে চড়লেও, আত্মপরিচয় প্রকাশ করি না। পারলে সদাই, এ=সি ফার্স্ট ক্লাসেই চড়তাম। তবে, ভারতীয় অধ্যাপকেরা তো অতটা ভাগ্য নিয়ে আসে না!
এন্টায়ার পলিটিক্যাল সায়েন্সের আদি গপ্পো
ভারতে কিছুকাল এন্টায়ার পলিটিক্যাল সায়েন্স বলে একটি কথা ভীষণ-ই চর্চিত। কোন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কিছুর হদিশ পাওয়া না গেলেও, অন্তত একজন আছেন যিনি ওটায় পণ্ডিত। উনিজি একাই!
পলিটিক্স বিষয়টা চিরকালই বেশ গোলমেলে। এটাই বোধ হয় প্রাচীনতম বিষয় যেটা মানুষ আদি লগ্ন থেকেই চর্চা করে চলেছে। ফলত এই সাবজেক্ট টাকে সবচেয়ে পরিপক্ক বললে অত্যুক্তি হবে না। বিশেষত ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে তো যাকে বলে খাপে খাপ। মহাভারত কে তো অনায়াসেই এন্টায়ার পলিটিক্যাল সায়েন্সের শ্রেষ্ঠতম কেস স্টাডি বলা চলে। কী একখান গল্প যার পেটে ওত পেতে আছে হাজার হাজার প্যাঁচ পয়জারের কিস্যা। যার মূলে সেই একমদ্বিতীয়ম চতুর চুড়ামনি মানবশ্রেষ্ঠ বাসুদেব। সব চরিত্রকেই ঘোল খাইয়ে মামেকং শরণং ব্রজ করিয়ে ছেড়েছেন। সেটা আবার মহিমান্বিত করার জন্যে যুদ্ধ থামিয়ে একটা গোটা শ্রী মদ্ভাগবত গীতাও নামিয়েছেন। কতক্ষণ যে লেগেছিল কে জানে! তবে যে ধোঁয়াশা তৈরি করে গেছেন, যার ব্যাখ্যা-অপব্যাখ্যা এখনও করে চলেছে মানুষ। এতো এতো ব্যখ্যা তার কোনটা ঠিক বা কোনটা ভুল কেউই জানে না। এই গোলকধাঁধা চিরন্তন! এর থেকে মুক্তি নেই! আজকের ভারতে আবার এরকম মহামানব পয়দা হয়েই চলেছেন। বিরামহীন। ভারতীয় মহাত্মারা সকলেই শ্রীকৃষ্ণের অবতার। জীবনের একাংশ গারদখানায় নির্দিষ্ট। ভারতের এক নামকরা হিন্দি হাস্যকবি সরল সম্পতজীর ব্যাখ্যাটা বেশ! ‘ভারতের বিশ্বগুরু হওয়া আটকায় কে! কারণ এখানে জেলে জেলে পর্যন্ত ভরা সাধু-সন্তরা রয়েছেন! কথাটা এক্কেরেই ঠিক। অবস্থাটা তেমন-ই। ভারতের রাজনৈতিক নেতারা যে এন্টায়ার পলিটিক্যাল সায়ান্টিস্টের বশেই থাকবেন, এতে ঘাবড়াবার কীই বা আছে! আর আছেন ও। জয় শ্রীকৃষ্ণ! শ্রীরামচন্দ্র তাঁর দ্বাপর এডিশনের জয়গানে ক্ষুণ্ণ হবেন বলে মনে হয় না।
যাই হোক, এখানের গল্পটা অবশ্য অতোটা গ্রাম্ভীর নয়।
যদিও বিভিন্ন দেশে, এমনকি ভারতেও, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিষয় টা অন্যান্য নামেও বিধৃত হচ্ছে, জনমানসে কিন্তু পলিটিক্যাল সায়েন্স নামটাই গেঁড়ে বসে আছে। আসলে ততো কিছু না জেনেই আমরা সায়েন্স কথাটাকে বেশ সম্ভ্রমের চোখেই দেখি। চিরকালই দেখে আসছি, ভাল ছেলেমেয়েরাই সায়েন্স নিয়ে পড়ে। আমাদের সময় থেকেই। আর্টস আর কমার্স ভাল ছাত্রের কাঙক্ষিত নয়। বাবামারা ছেলে সায়ান্স না পেলে ডিপ্রেশনে ভোগেন। এখন না হয় এমবিএ বলে একটা পথ তৈরি হয়েছে ভবিষ্যতে জাতে ওঠার, বাবার পয়সা থাকলে তো কথাই নেই, তেমনটা তো আগে ছিল না। তবুও ভাল ছেলে মেয়েরা ইঞ্জিনীয়ারিং পড়েও শেষ পর্যন্ত বেচা শিখতে এমবিএ পড়তেই আসে। যাহোক, কথা হচ্ছে পলিটিক্যাল সায়ান্স নিয়ে।
এ’ নিয়ে দুটো স্মৃতি আমাকে বেশ নাড়া দেয়। এখনও।
আমাদের শৈশবে র্যাশন শপ বলে একটি অবধারিত বিষয় ছিল। সরকার বাহাদুর সকলকেই অপেক্ষাকৃত কম দামে সাপ্তাহিক খাদ্য যোগান দিতেন। প্রত্যেকের নামেই র্যাশন কার্ড থাকতো। সমবায় ভান্ডারে প্রতি সপ্তাহেই হানা দিতে হতো। কাঁকরমণি চাল, লাল পি এল ৪০ গম, আর চিনি কিনতে। ওগুলো খোলা বাজারে পাওয়া যেত না। গেলেও, দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। তবে আমাদের একবার নয়, বেশ কয়েকবারই ঢুঁ মারতে হতো প্রতি হপ্তায়। স্রেফ খোঁজ নেবার জন্যে। কারণ পাবই এমন নিশ্চয়তা খুব দৃঢ় ছিল না। বিশেষত চিনি। ফলে জীবনের অনেকটা সময়ই র্যাশন শপের জন্যে বরাদ্দ রাখতে হতো। বিশেষত, বেকার ও অবসারপ্রাপ্ত প্রবীণদের। এই অবধি পড়ে আবার কেউ যেন মনে না করেন ভারি দুঃখের কাহিনি ফাঁদতে বসেছি। একেবারেই না। বরং এই সুযোগে নানাবিধ আড্ডা, বাদানুবাদ আর রগড়ে সময়টা বেড়েই কাটাতাম। ভাল এন্টারটেইনমেণ্ট। বেকার ও রিটায়ার্ড পাব্লিকের জন্যে অনবদ্য। সে ছিল এক বিচিত্র যুগ। পুরো জনপদে একটি বা দুটি বড়ো লোকের বাড়িতে কালো ব্রোমাইড ল্যান্ডফোন। যেগুলো আবার বেশিরভাগ সময়েই ডেড বা ক্রসকনেকশন আক্রান্ত। এন্টারটেনমেন্ট বলতে আকাশবাণী আর বিশাল গুদামের মতো স্থানীয় সিনেমা হল। সেগুলো অবশ্যই পয়সা দিয়ে। রেডিও বা ট্রান্সিস্টর সেটের জন্যেও ফি বছর লাইসেন্স ফী ভরতে হতো। তবে বিনিপয়সার বিনোদনও ছিল প্রচুর। যেখানে যাও, যেখানে চাও, লাইন লাগাও। র্যাশন দোকান সেই রকম একটি রণ ও রঙ্গক্ষেত্র। মোড়ের চায়ের দোকানগুলোও ছিল। তবে তা একদমই বয়স্কদের অধিকারে।
একদিনের কথা মনে আছে। দুই প্রবীণের তীব্র বাদানুবাদ। দুজনেই পাড়ার কাকু। সুজিত কাকু আর বিশ্বাস কাকু। মহা গোলমাল। দুজনকেই খুবই শান্ত মেজাজের বলে জানতাম। অবশ্য সুজিত কাকু একটু বেশি পছন্দের ছিলেন। একটু বেশি শিক্ষিতও বোধ হয়। বাম রাজনীতি করতেন। আর বিশ্বাস কাকু আমার সহপাঠী অতীনের বাবা। বিবাদটা পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে। পলিটিক্যাল সায়েন্সের ডিগ্রী কে বিএ না বিএসসি বলা হবে? বিবাদটা এই নিয়ে। সুজিত বাবুর বিএ যুক্তি বিশ্বাসকাকু কিছুতেই মানবেন না। কইলেই হইলো? পষ্ট লিখা আছে সাইয়েন্স, বিএসসি-ই হইব! এক্কেরে পরশুরামের চিকিৎসা সঙ্কটের ট্রামের সেই বৃদ্ধ সহযাত্রীর যুক্তি, আরে ম’লো যা; পষ্ট দেখলুম লেগেছে, আর বলছে লাগে নি! বঙ্কুবাবু নেহাৎই অসহায়! সুজিতবাবুরও তেমতি হাল। আবার ভীড়ের বেশির ভাগের সমর্থনই বিশ্বাসসবাবুর দিকে। সায়েন্স বলে কথা! সায়েন্স মানে যে বিজ্ঞান এটুকু আর কে না জানে! আমি স্কুল শিক্ষকের ছেলে। ফলে ক্লাস এইটে পড়লেও ওটা যে বিএ হবে তা আমার অবগত ছিল। আমি বললেও কেই বা শোনে! চুপই ছিলাম। কিছু পরে কে যেন খবর দিলো, চাল এসেছে। এবং সেদ্ধ চাল। যেটা তখন র্যাশনের দোকানে প্রায় অভাবনীয়! ফলে তক্কাতক্কি আর এগোল না! ভীড়ের অনেকেই এতো স্বল্পস্থায়ী ক্যাচালে বিশেষ আমোদ হোল না বলে খানিক ক্ষুব্ধ থাকলেও, চাল নিতেই দৌড়ল। আর কখনও এই দুজনের তক্কো হতে দেখিনি।
তবে এই নিয়ে দ্বিতীয় গল্পটা একটু বেশি রোমহর্ষক।
তখন সিদ্ধার্থশংকর রায়ের শাসন পশ্চিম বাংলায়। খুব যে সুশাসন এ’কথা রায়সাহেবের অতি বড়ো সমর্থকও বোধ করি বলবেন না। তখন আমাদের অঞ্চল কাঁপাচ্ছেন তৎকালীন নব কংগ্রেসের এক লোকাল যুব ন্যাতা। কতটা যুব বুঝতাম না। একটা মাঝবয়েসী ভুঁড়েল লোক, মাথার সামনেটা বিলকুল ফাঁকা। সে অভাব পুষিয়ে দিয়েছে পেছন দিকের লম্বা চুল। নাম ধরুন অমল চক্রবর্তী। দেয়ালে দেয়ালে স্লোগানঃ তোমার প্রিয়, আমার প্রিয়, অমল চক্রবর্তী যুগ যুগ জিও! সারা মহল্লা ভয়ে কাঁপতো। তিনি স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিলেন। সারা সেন্টার তটস্থ। একজন ওনার কষ্ট লাঘবের জন্যে উত্তরপত্র ভরাট করছেন। উনি সেই উত্তেজনায় ঘন ঘন চা খাচ্ছেন। এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। এবং উনি ফার্স্ট ডিভিশনে পাশও করলেন!
তা লোকাল কলেজের এ্যানুয়াল সোশ্যাল হচ্ছে। অমল বাবু প্রধান অতিথি। মঞ্চ আলো করে বসেছেন। অধ্যক্ষ্য মহাশয় ছাগল ছানার মতো পাশে বসে বিগলিত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন। এবার এলো সেই শুভক্ষণ। ঘোষণা হোল, এবার প্রধান অতিথির ভাষণ দেবেন এলাকার অভিভাবক তরুণের হৃদয়মণি যুবনেতা ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমরাও খুবই উৎসুক। কারণ ওর বাকক্ষমতা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রচুর কৌতূহল ছিল। বিশেষত একটি কলেজের মঞ্চে। কিন্তু ভালই শুরু করলেন। একটা ফিরিস্তি দিলেন, মাকুরা কলেজটাকে আন্দোলনের নামে ধ্বংস করেছিল, ওঁরা কী ভাবে নতুন করে গড়ে তুলছেন। যা হোক সকলেই অপেক্ষায় কখন থামেন। কিন্তু মজাটা এবারে শুরু হোল। এতকাল পরে হ’লেও, দিব্যি মনে আছে।
‘বন্ধুগণ, আমাদের এই কলেজের জন্যে আরও অনেক কিছু করতে হবে। জানেন, এখানে পলিটিক্যাল ন্সায়েন্স পড়ান হয়, কিন্তু একটা ল্যাবরেটরি নেই! কী লজ্জার কথা!’ ততক্ষণে আমরা দর্শকেরা বেশ নড়েচড়ে বসেছি। মঞ্চে অধ্যক্ষও। বেদম হাসি পেলেও কিচ্ছু করার নেই। এই সময়ে দেখলাম, কেউ একজন তরুণ তুর্কিকে কানে কানে কিছু বলে গেলেন।
অমল বাবু তাকে আশ্বস্ত করে আবার শুরু করলেন। বরং একটু বেশি বিক্রমেই।
‘বন্ধুগণ, আমার একজন বন্ধু আমাকে কানে কানে বলে গেলেন, পলিটিক্যাল সায়েন্সের জন্যে ল্যাবরেটরি না হলেও চলে! এটা কেমন কথা! আমাদের যতো অভাবই থাকুক, আমরা একটা ফাসক্লাস ল্যাবরেটরি বানাবই। কোন বাধাই আমাদের দমাতে পারবে না! দরকার হলে রক্ত দেবো!’ সঙ্গে সঙ্গে আকাশ বাতাস অন্ধকার চিরে মুখরিত হয়ে উঠলো, তোমার প্রিয়, আমার প্রিয়/ যুগ যুগ জিও, যুগ যুগ জিও!’
এর পর ঠিক কী ঘটেছিল আর মনে নেই!
তাই বলছিলাম, পলিটিক্যাল সায়েন্স বড়ো বিষম বস্তু! এন্টায়ার পলিটিক্যাল সায়েন্সের আদি যুগের একটি ঘটনার সাক্ষী নিজেই ছিলাম।
যাপন-নামা (পর্ব ৮)
▮ মণিপদ্ম দত্ত
▮ মণিপদ্ম দত্ত




মন্তব্য