১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর জন্ম নেন ঢাকা শহরে। বাবা ছিলেন পেশায় হাকিম। বাবা সুরেশচন্দ্র ও মা ইন্দুবালা। মায়ের বাবা মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য সেই সময়ের রাজশাহী শহরের প্রতিষ্ঠিত ব্যবহারজীবি। এই পরিবারের আদি পদবী ছিল বাগচী, ‘ঘটক’ ছিল এই বংশের প্রাপ্ত উপাধি। ১০ ভাই বোন ছিলেন তারা। কনিষ্ঠতম জ্যোৎস্নানাথ (জোনাকি) জন্মের তিন বছরের মাথায় মারা যান। সুরেশচন্দ্রের পরিবারে একসাথে বড় হয়েছেন বাকি পাঁচ ছেলে ও চার মেয়ে। এর মধ্যে ঋত্বিক ও প্রতীতি ছিলেন যমজ ভাই বোন। পরিবারের সকলে এই দুই ভাই বোনকে ডাকতেন ভবা ও ভবী নামে। ১৯৩৩/৩৪ সাল নাগাদ তাঁর বাবাকে একপ্রকার বাধ্যতামূলক অবসর নিতে হয়। এমনকি যথাযথ পেনশন থেকেও বঞ্চিত করা হয়। আর্থিক চরম বিপদে পড়ে যায় তাঁদের পরিবার। অল্প বয়সেই পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব মাথায় তুলে নেন বড় দাদা মনীশ ঘটক। তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বিএ পাশ করেন ১৯৪৮ সালে। কলকাতায় এসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়া শুরু করলেও পড়াশোনাটা তাঁর কাছে অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে সরে যায়।
ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগ দিয়ে নাটক লেখা, পরিচালনা, নাটকে অভিনয়ে মেতে ওঠেন তিনি। এই সময়ে চলচ্চিত্র বিষয়ক বইয়ের পোকা হয়ে ওঠেন দিনে দিনে। লিখতেও শুরু করেন। বাংলা, ইংরেজি দুই ভাষা মিলিয়ে শুধুমাত্র চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রবন্ধ লেখেন ৪০টি। অন্যান্য বিষয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রবন্ধ লেখেন ২০টি। ১৯৫০ সালে তাঁর এম এ ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার কথা। তিনি পরীক্ষা না দিয়ে চলচ্চিত্রের সাথে সহকারী পরিচালক হিসাবে যুক্ত হয়ে যান ১৯৫০ সালে। একক ভাবে তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘নাগরিক’ তৈরি করেন ১৯৫২ সালে। এই ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালে। ১৯৫৬ সালে মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত ছবি ‘অযান্ত্রিক’। ইতিমধ্যেই তিনি ভাঙা বন্দর, দলিল, অফিসার, সাঁকো, সেই মেয়ে, জলন্ত, হিন্দীতে মুসাফিঁরোকে কে লিয়ে নাটকগুলো প্রযোজনা, পরিচালনা করেছেন। নাটকগুলোতে অভিনয় করেছেন। এছাড়া অভিনয় করেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকে। অনুবাদ করেছেন দুটি নাটক ‘গ্যালিলিও চরিত’ ও ‘খড়ির গন্ডী’। তিনি তিনটে রেডিও নাটক ‘জ্বালা’, ‘কালো সায়র’ ও ‘মা’ প্রযোজনা ও পরিচালনা করেছিলেন। এই সময় পর্বে তিনি সেই সময়ের সুখ্যাত পরিচয়, দেশ, অগ্রণী, শনিবারের চিঠি, গল্প ভারতী ইত্যাদি পত্র-পত্রিকায় ৪০টি গল্প প্রকাশ করেন। নিজে দুটো পত্রিকা (অভিধারা ও অভিনয় দর্পণ) সম্পাদনা করেছেন।
১৯৫৫ সালে বিয়ে করেন বিদ্যালয় শিক্ষিকা সুরমা ভট্টাচার্যকে। তাঁর দুই মেয়ে (সংহিতা, শুচিস্মিতা) ও এক ছেলে (ঋতবান)। বই আর রেকর্ড ভালোবাসতেন খুব। পাশ্চাত্তের ওল্ড ক্লাসিক্স (বিশেষ করে বিটোফেন) শুনতেন বেশী। ছিলেন লোকসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীতের একনিষ্ঠ ভক্ত। বাংলায় মানিক, মাইকেল, প্রমথেশের লেখা পড়তেন। মায়ের ধারা থেকে পেয়েছিলেন বই পড়া আর গানের অভ্যাস। আর বাবার ধারা থেকে পেয়েছিলেন বিদ্যানুরাগ। ১৯৬৫ সালে তিনি পুনার ফিল্ম ইন্সটিটিউটে উপাধ্যক্ষ হিসাবে যোগ দিয়ে দুই বছর চাকরি করেন। চাকরি ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আবার সিনেমার কাজ নিয়ে মেতে ওঠেন। ১৯৬৯ সালে তিনি পদ্মশ্রী পান।
অত্যধিক মদ্যপান তাঁর যাপনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করায় তাঁর ক্রিয়েটিভিটি ক্ষতিগ্রস্থ হতে শুরু করে। দিনের পর দিন অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে দিন কাটতে শুরু করে। যক্ষা হয়। চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই নিজেই বন্ডে সই করে হাসপাতাল থেলে পালিয়ে চলে আসেন। হাসপাতাল আর বাড়ি চলতে চলতে এক সময় এস এস কে এম হাসপাতাল থেকেই চলে যান পৃথিবী ছেড়ে। আর বাড়ি আসা হয় নি। জীবনের শেষ তিন দিন অজ্ঞান অবস্থাতেই ছিলেন। শেষ দিনটা ছিল ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। সময় রাত ১-৫০। নিজের প্রতি অযত্ন, অবহেলা থেকে অকালে আমাদের হারাতে হল এই ভারতীয় উজ্জ্বল নক্ষত্রকে সিনেমায় তাঁর অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন সম্পর্কে মূল কয়েকটি দিক আলোকপাত করে এই আলোচনা শেষ করছি। তিনি একজন বামপন্থী ও মার্ক্সবাদী ভাবধারার মানুষ। এর প্রতিফলন হিসাবে আমরা তাঁর সিনেমার মূল ভিত্তি হিসাবে দেখেছি সমাজ ও মানুষের অর্থনৈতিক শ্রেণিসংগ্রাম। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষের অর্থনৈতিক বিপর্যয় কে তিনি পর্দায় তুলে ধরেন। তাঁর বিখ্যাত ‘দেশভাগ ত্রয়ী’ (মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখা) প্রধানত উদ্বাস্তুদের বেঁচে থাকার অর্থনৈতিক লড়াইয়ের দলিল। মেঘে ঢাকা তারা সিনেমায় তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে গিয়ে বড় মেয়ে 'নীতা'-কে নিজের জীবন, স্বপ্ন ও অস্তিত্ব বিসর্জন দিতে হয়। নাগরিক বা সুবর্ণরেখা ছবিতে তিনি পুঁজিবাদের নিষ্ঠুর রূপ এবং বুর্জোয়া সমাজের অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
চলচ্চিত্রের পর্দায় যিনি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলেছেন, তাঁর নিজের জীবন কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ঋত্বিক ঘটক অর্থনৈতিকভাবে নিজে নিঃস্ব হয়ে গেলেও, সিনেমার পর্দায় সাধারণ খেটে-খাওয়া, শোষিত ও ছিন্নমূল মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার ও সংগ্রামের যে বাস্তব রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন, তা বাংলা চলচ্চিত্রে অতুলনীয়।
লেখক: অধ্যাপক, বাণিজ্য বিভাগ ও প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, কল্যাণী।
ঋত্বিক ঘটক: পরিবার, কর্মজীবন ও সিনেমায় অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
▮ ড. বিশ্বম্ভর মণ্ডল
▮ ড. বিশ্বম্ভর মণ্ডল




Asampurno asatya
উত্তরমুছুন