মানুষ দরজায় তালা দেয় কেন?
একটি দার্শনিক সন্দর্ভ
ঘটনাটা মূলতঃ এক বন্ধুর অভিজ্ঞতা। তবে আমিও এক অংশিদার। আমারই বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃতত্ব বিভাগে পড়াত। আমরা তখন সদ্য চাকরিতে ঢুকেছি। বছর দুয়েক হবে। তখনও প্রায় বোহেমিয়ান জীবন। আমি বাবা মা’র সঙ্গেই থাকি। তবে ও ঠিক শহরের ছেলে নয়। ফলে কলকাতায় একটা ছোট বাসা তার ছিল। শেয়ালদা স্টেশনের কাছাকাছি। সে বাসা ছিল মূলত আমাদের মতো বন্ধুদের একরকম পার্মানেন্ট ঠেক। বহু সন্ধে কেটেছে সেখানে। তবে ফিল্ডওয়ার্কে যখন এখানে সেখানে যেত, বাসা আমাদেরই দখলে থাকতো।
একবার কী কারণে যেন, সবাই-ই কলকাতার বাইরে। আর ওর ফিল্ড এসে গেলো। ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে অযোধ্যা পাহাড় জেতে হবে এক হপ্তার জন্যে। অফিসিয়াল কাজ। যেতেই হবে। ও একটু ঘাবড়ে গেলেও আমরা অভয় দিলাম। নো চিন্তা। একটা ভাল তালা কিনে দরোজায় লাগিয়ে দিলেই নিশ্চিন্তি। আমরা কয়েকজন বৈঠকখানা বাজার ঢুঁড়ে ফেলে একটা জম্পেশ তালা কিনে ফেললাম। জম্পেশ ই বটে। কেল্লা ফতে। ওর আর কী এমন জিনিসপত্র, বইপত্তর ছাড়া! আমরা আবার উলটে ভাবলাম, এমন বাহারি তালাই না আবার বিপদ ডেকে আনে! তিনটে চাবির দুটো দুই বন্ধুর কাছে। একটা সব্যসাচীর নিজের কাছে। ফলে চাবি হারানোর রিস্কটাও আর রইলো না।
যথাবিহিত সব্য গড়ে তালা লাগিয়ে পগার পার।
এই অবধি সবটাই ঠিক ছিল। কিন্তু কদিন বাদে এক সন্ধ্যে বেলা সব্য আমার বাড়িতে হাজির। উত্তেজিত, বিধ্বস্ত, হাঁপাচ্ছে। এক গেলাস জল খেয়ে খানিকটা ধাতস্থ হয়ে যা বলল, আমাদের মাথায় হাত। ফিল্ড থেকে দিন সাতেক বাদে ফিরে দেখে, তালা ভাঙা, দরোজা হাটখোলা; আর সারা ঘর জুড়ে আশাহত চোরের আক্রোশ! বইপত্তর, বিছানা, মশারি সব লন্ডভন্ড। খোয়া কিছুই যায় নি, কারণ চোরের নেওয়ার বিশেষ কিছুই ছিল না। ভাঙা তালাটাও ফেলে গেছে। আমাদের রাগটা এবার তালাওয়ালার উপর পড়ল। কী বদমাশ লোক। বলেছিল আলীগড়ী তালা। দামটাও বেশ নিয়েছিল। দল বেঁধে বেরিয়ে পড়লাম। এতো আমাদের সকলের প্রেস্টিজ একেবারে আলুর দম। সহ্যের একটা সীমা আছে!
তালার দোকান খোলাই আছে। বয়স্ক তালাওয়ালাকে যতটা সম্ভব গালাগালের পর দেখলাম, মহাশয় একেবারেই নির্বিকার। বরং যেন একটু দার্শনিক মৃদু হাসি ঠোঁটের ফাঁকে। হরবড় ক’রে সব অভিযোগ উগরে দিয়ে আমরাও একটু ক্লান্ত। এবার তালাওয়ালা ভদ্রলোকের পালা। গলাটা ঈষৎ ঝেড়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বাবুরা, তালাটা কিনেছিলেম কেন? মহা ধড়িবাজ লোক তো! সমস্বরে চেচিয়ে উঠলাম, মানে? ঘরে তালা দিয়ে চোর আটকানোর জন্যে! তালা তো এই জন্যেই! লোকটি তাও নির্বিকার। শান্ত গলায় বললেন, বাবু, তালা দিয়ে কি চোর আটকান যায়? যাঃ বাবা, বলে কী! আমরা আরও চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তা হ’লে?! এর পরের উত্তরটা একেবারে যাকে বলে ব্রহ্মাস্ত্র! বাবু, তালা দেওয়া মানে, বাবু বাড়ি নেই! আমরা বাকরহিত! হতভম্ব!
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঝাঁক কচি অধ্যাপককুলের এরপরে আর বলার কীই বা থাকতে পারে!
মঞ্জু
কিছুদিন হোল মঞ্জু আমার ডমেস্টিক হেল্প। দিল্লির উপভাষায়, কামওয়ালি । কাজের লোক। এখানে মজা করে বিজেপিও বলে। অর্থাৎ বর্তন, ঝাড়ু, পোছা। ঘরের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজগুলো তারা করে। মূলত মহিলাই হন। অবশ্য মঞ্জু আমার খাবারটাও বানায়।
পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়েস। সামান্য বেশিও হতে পারে। দোহারা চেহারা। প্রথম দর্শনে ওকে একটু আলাদাই মনে হয়েছিল। মৃদুভাষী, তবে স্পষ্টবাক। প্রথমেই বলে নিল, কতো দিতে হবে; আর, রবিবারে কাজে আসবে না। একটু থমকে গেলেও রাজি হয়ে গেলাম। মনে হোল এই মহিলাটি সোজাসাপ্টা আছে। বহাল করলাম।
মঞ্জু সঠিক সময়ে আসে, কাজ করে, বিনা প্রয়োজনে কথা বলেনা, কেবলমাত্র কী রান্না করতে হবে আর কোন বিশেষ ভাবে কিনা। যাওয়ার সময় বলে যাওয়া, ভাইয়া, দরওয়াজা বন্ধ কর দিজিয়ে! ব্যাস। সোম থেকে শণি একই শিডিউল। আমার সুবিধেই হোল। আমি আমার কাজকম্ম নিয়ে পড়ার ঘরে দিব্যি নিজের মনে কাজ করি। কাজের মহিলা নিয়ে যাকে বলে ভোগান্তি, কিছুই তেমন নেই। আর আমার একার জীবনে এর থেকে বেশি কী আর চাই!
গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি বলল মার্চ মাসের শেষ দু হপ্তা ও আসবে না; তবে একজনকে দিয়ে যাবে। কারণটা হচ্ছে, ছেলের বিয়ে। আমার কাছে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার চাইল। এবারে একটু ধাক্কা খেলাম। বলে কী? পঞ্চাশ হাজার টাকা! আবার না দিলে যদি কাজ ছেড়ে দেয়! আমতা আমতা করে বললাম, অতো টাকা তো দিতে পারব না! সরাসরি জিজ্ঞাসার উত্তরে আমি দশ হাজার বললাম। ও কিন্তু খুব ধীর শান্ত ভাবে বলল, ঠিক আছে। দশই দেবেন; কবে দিতে পারব জেনে নিয়ে কাজে মন দিলো। তবে ধার টার নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা বিশেষ সুবিধের নয়। মনটা একটু খিঁচড়েই থাকলো। অগত্যা নির্দিষ্ট দিনে টাকাটা ওর হাতে তুলে দিলাম আর ভাবলাম, এ টাকার কথা ভুলে যাওয়াই ভাল।
তারপর তো ওর ছুটি নেওয়া। ভাবলাম, পনের দিন বলেছে, কতদিনে আসবে কে জানে!
কিন্তু, বদলি মহিলা মঞ্জুর ফেরার দিনের আগেই বলে দিলো, মঞ্জু কাল থেকে আসবে। আবার চমক। এরকম ঘটনা খুব বেশি ঘটতে দেখিনি। পরদিন মঞ্জু আগের মতোই এলো, কাজ সারলো। তবে যাওয়ার আগে আমার কাছে এলো। ঐ দশ হাজার টাকাটা আমি কি ভাবে ফেরত নিতে চাই? আমি তো পুরো টলে গেছি। নিজের লোকেরা, মায় বন্ধুবান্ধবকে টাকা ধার দিলে পর্যন্ত, এতো সহজে ফেরত পাওয়া যায় না। বলতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে ফেরতই দেয় না। বরং ব্যক্তিগত তিক্ততা বহু ক্ষেত্রেই বিধিলিপি হয়ে দাঁড়ায়! আর এ তো কাজের লোক! আমি শুধু জিজ্ঞেস করতে পারলাম, এই তো সবে নিলে! এখনই ফেরত দিতে পারবে? মঞ্জুর সহজ উত্তর, যে কাজে নিয়েছিলাম তা’তো হয়ে গেছে। হাতে টাকাও আছে। সুতরাং দিতে অসুবিধে নেই। পরদিনই নগদে টাকাটা দিয়ে দিলো। গুনেও নিতে বলল। আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। খানিকটা আত্মগ্লানিও হোল! আমি কতো কী না ভেবেছি। তবে মঞ্জু সম্পর্কে কৌতূহল বাড়ল! জটায়ু লালমোহন গাঙ্গুলির কথায়, ভাবলাম একটু কালটিভেট করতে হবে। করছিও। এবং কৌতূহল বাড়ছে।
গত ২৫ শে ডিসেম্বর আর ১লা জানুয়ারী ছুটি নিয়েছিল। তখন সেটা নিয়ে কিছুই ভাবিনি। আজকাল মাঝে সাঝে ওর সঙ্গে একটু আধটু কথা বলি। কথায় কথায় জানতে পারলাম, ও খ্রিস্টের ভক্ত। ওর নিজের কথায়, যীশু ওর ‘পরমাত্মা’। আমি জিজ্ঞেস করলাম তাহলে তুমি খ্রিস্টান? ওর উত্তর, না। আমি পরমাত্মাকে মানি। ‘ও বুঝলাম, তুমি হিন্দু হলেও, যীশু খ্রিস্টের ভক্ত’। ও একটু চুপ করে থাকলো। তারপর বলল, ‘না, আমি আর হিন্দু নই!’ আমার জিজ্ঞাসা, ‘তাহলে তুমি চার্চ মানো’। মঞ্জু এবারে একটু যেন ইমোশনাল হয়ে পড়লো। একটা ছোটখাট দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলো, ‘আমি তো চার্চকে মানি; কিন্তু ওরা তো আমায় মানেনা। যাই, বাইরে থেকে দেখি, প্রার্থনা করি। আমাদের তো ঢুকতে দেয় না’। আমাদের? মানে? তোমার ফ্যামিলির কথা বলছো? ওর কথা শুনে তো আমার আরও অবাক হবার পালা। ও জানাল, ওরা ফ্যামিলিতে তিন জন। ওর এক ছেলে আর এক মেয়ে। ও আর ওর মেয়ে খ্রিস্টকে মানে, কিন্তু ছেলে নয়। ওর স্বামী অনেক দিন আগেই মারা গেছে। চার্চ চায়, ওরা পুরোপুরি ধর্মান্তরিত হয়ে যাক। কিন্তু মঞ্জুর আপত্তি এখানেই। ওর সমাজে এভাবে খ্রিস্টান হয়ে গেলে, পারিবারিক সম্পর্কগুলো খুবই গুলিয়ে যাবে। তাই ও মনে মনেই খ্রিস্টান থাকতে চায়। আমার বিস্ময় দেখে ওর মন্তব্য, ভাইয়া ইস মে দিক্কত তো কুছ নহি হ্যায়। আমি আর কী বলি। ভাবছি, একটি নিরক্ষর মধ্যবয়সিনীর কী আশ্চর্য সেকুলার মানসিকতা! আমার শ্রেণীর মধ্যে তো একেবারেই দুর্লভ। এবারে, জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে তোমার ছেলের নিশ্চয়ই খ্রিস্টান মতে বিয়ে দিয়েছ? মঞ্জু শান্ত গলায় বলল, নহি। ক্যিউ কি, মেরা বেটা তো আভি তক হিন্দু ধরম কো মানতা হ্যায়। তো উসকা শাদি তো হিন্দু তারিকাসেই হোনা চাহিয়ে, না?’ আমি রুদ্ধবাক! আরও বলল, যেহেতু ওর মেয়ে খ্রিস্টকে মানে, ওর মতোই, সে যদি চায়, খ্রিষ্টান মতেই তার বিয়ে দেবে। বরং ওর জন্যে খ্রিস্টান পাত্রই খুঁজবে; আর মেয়েকেও চার্চে গিয়ে পুরোপুরি খ্রিস্টান হতে বলবে। ওর মেয়েটি করেস্পন্ডসে বিএ পড়ছে!
আমি সত্যিই হতবাক। সারা দেশে গত এক দশকের উপরে যে ধর্মীয় ঘৃণার চাষ চলেছে, সেখানে আমাদের অজান্তে মঞ্জুরাও আছে। কী অদ্ভুত অন্যতর চিন্তা! আর আমরা ভাবি, আমরা শিক্ষিত মধ্যবিত্তরাই সব সেক্যুলার, সব বুঝি! এবং যার ফল স্বরূপ, আমরা যতো জানি তবে জানি নে! আমাদের ভাবনা ও কাজকর্মে কী বৈপরীত্য!
ওর কথায়, ওর এই খ্রিস্ট ভক্তি শুরু হয়েছে করোনা কালে! যখন ওও সকলের মতোই ঘরবন্দী ছিল। তার এক বছর আগেই ওর স্বামী অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। সব দিক দিয়েই বিপর্যস্ত। ও একটু চুপচাপ প্রার্থনা করতে চাইত। ঘর লাগোয়া এক মন্দিরে গিয়ে চেষ্টা করতো। কিন্তু, ওর কথায় সেখানে নাকি পুজো করা সম্ভব, কিন্তু প্রার্থনা নৈব নৈব চ। বড্ড কোলাহল। আর্থিক অবস্থাও করুণ। সেই সময়ে পাড়ার একজন ওকে একটা যীশুর ছবি দেয়। যীশুর গল্পও বলে। ওর নাকি এটা জেনে অবাক হয়েছিল, যীশু নাকি যারা ওকে মেরেছিল, তাদেরকেও ক্ষমা করেছিলেন। তখন থেকে ও ঐ ছবিটা সাথে রাখতো। আর ও নিজের মতো করে বাড়িতেই প্রার্থনা শুরু করে দিলো। মন শান্ত হতে শুরু করলো। এই তার খ্রিস্টপ্রেমের ইতিহাস। এর মধ্যে নতুন বা অস্বাভিক কিছু নেই। খ্রিস্টের জায়গায় কৃষ্ণও হতে পারত। মানুষ তো এভাবেই তার শান্তির জায়গা খুঁজে নেয়। মার্ক্স সাহেবও তো বলে গেছেন,
Religion is the last sigh of the oppressed creature, the heart of the heartless world…
আমরা তো এটুকু এড়িয়ে গিয়ে, শুধু, it is the opium of the people, এই খণ্ডিত অংশটাই মনে রাখি। কিন্তু ধর্ম বা ঈশ্বর নিয়ে মঞ্জুর মতো এতো স্বচ্ছ ধারণার গল্পটাই আসল। আমাদের শিক্ষায় প্রকৃত অন্তর্বস্তুর বড় আকাল। আমরা ভুলে বসে আছি, যে মানুষগুলি মৌলিক ধর্মবোধের স্রষ্টা, এবং পৃথিবীতে যাঁদের প্রবর্তিত আইডিয়া এখনও চলমান, গৌতম বুদ্ধ, কনফুসিয়াস, যীশু থেকে হযরত মহম্মদ, সকলেই নিরক্ষর হলেও শিক্ষিত ছিলেন।
মঞ্জুর মতো মানুষরা আছে বলেই হয়তো দুনিয়াটা পুরোটাই পুড়ে যায় নি। বলার কথা এটুকুই।
যাপন-নামা (পর্ব ২)
মণিপদ্ম দত্ত
মণিপদ্ম দত্ত




মঞ্জুর মতো মানুষ অতি বিরল।
উত্তরমুছুনপ্রতিভা সরকার