প্রিয় ঋত্বিক, আপনি নেই। তবু আপনি আছেন। আপনি আছেন জীবনঘনিষ্ঠ প্রতিটি ফ্রেমে, প্রতিটি আর্তনাদে, প্রতিটি চাবুকের শব্দে। আপনার সিনেমা আমাদের চোখে জল আনে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আমাদের আলোড়িত করে। আমাদের ভোঁতা বিবেক সামান্য হলেও নড়েচড়ে ওঠে।
আপনি বলেছিলেন, “একদিন মানুষ আমার সিনেমা বুঝবে। আমার ছবি পাগলের মতো খুঁজবে। তোমরা দেখে নিও!’’ আপনি সত্যিই ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন প্রিয় ঋত্বিক! আপনার জন্মের এক’শ বছর পূর্ণ হতে চলেছে, তারপরও দেখুন, আজও আপনাকে খোঁজার পালা, চেনার পালা আমাদের ফুরায়নি। আজ আপনাকে ঘিরে বোদ্ধাদের চৌকস কথার ফুলঝুরি। আমরা যারা অতি সাধারণ, সামান্য দর্শক মাত্র, যৎসামান্য হলেও আপনার চলচ্চিত্র বুঝতে শিখেছি। কিন্তু হায়! যখন আপনি নেই, তখন বুঝেছি। যখন আপনার দরজায় ক্ষুধা, অবহেলা আর অবজ্ঞা কড়া নাড়তো, তখন আমরা মুখে কুলুপ এঁটে ছিলাম। আপনার সিনেমা সেন্সর বোর্ডে আটকে গিয়েছিল, প্রযোজক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, দর্শক হলে আসেনি। আমরা কেউ তখন আপনার পাশে দাঁড়াইনি। অপনি অভিমানে, ক্ষোভে একা একাই পুড়েছেন।
আপনি মানুষটা ছিলেন ক্ষ্যাপাটে, বড্ড একরোখা, আপসহীন। আপনার সেই একরোখা মনোভাবই তো আমাদের আয়নায় মুখ দেখতে শিখিয়েছিল। আপনি নিরন্তর আমাদের লক্ষ্য করে বলে গেছেন, “ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।” কিন্তু বিনোদনের মোহে ডুবে গিয়ে আপনার সেই আহ্বানকে আমরা অবহেলায় এড়িয়ে গেছি।
অথচ আপনি চলে যাওয়ার পর মেঘের আড়াল সরে গিয়ে ঋত্বিক ঘটক নামের উজ্জ্বল তারাটির কাজের ধারা পৃথিবীব্যাপী ধীরে ধীরে যখন ছড়িয়ে পড়লো, আমরা নড়েচড়ে বসলাম। আমরা চমকিত হলাম। ভিনদেশের নামকরা ইন্সটিটিউশন- গুলোতে যখন আপনাকে নিয়ে আয়োজন শুরু হলো, আমাদের যেন টনক নড়লো। আমরা তখন সপাটে সে গৌরবের ভাগীদার হতে চাইলাম। সরবে কিংবা সন্তর্পণে স্বীকারে করে নিলাম- হ্যাঁ, আমাদের ঘরের ছেলে ঋত্বিক রত্নতুল্য একজন চলচ্চিত্রস্রষ্টা ছিলেন বটে। আমাদের আহ্লাদ দেখে মেঘে ঢাকা তারা, আপনি মুচকি হাসলেন বুঝি! সুবর্ণগাঁয়ে বসে আপনি হাসুন– জীবনভর কেবল দীর্ঘশ্বাস আর গোপন অশ্রুপাতে সময় গেছে- আপনার প্রচুর হাসি পাওনা। হাসুন এবং আপনার মেলোড্রামাটিক কটাক্ষে আমাদের বিদ্ধ করুন, ওটি একান্তই আপনার বার্থ রাইট। এবং আমরা তারই যোগ্য। কিন্তু দোষ তো আপনারও কম নয় প্রিয় ঋত্বিক। চিন্তা-চেতনায় আপনি আপনার সময়ের চেয়েও ছিলেন অগ্রবর্তী। ছেঁড়া চটি পায়ে অমন ফটফটিয়ে আমাদের পেছনে ফেলে অতটাই এগিয়ে থাকবেন– এ আমাদের সীমাবদ্ধ মগজের চৌহদ্দিতেই আসেনি যে! উপরন্তু আপনি ছিলেন শেকড় উপড়ে যাওয়া এক উদ্বাস্তু। পশ্চিমবঙ্গের অন্নজল আপনাকে প্রাণে বাঁচালেও পূর্ববঙ্গের শেকড় উৎপাটনের যাতনায় আপনার অন্তরাত্মা হয়ে উঠেছিল মৃতপ্রায়। নাড়ী পোতা মাটি হারানোর ব্যথা কাউকে জীবনভর অতটাই তাড়িয়ে বেড়ানোর শক্তি রাখে, এ সত্য বোঝার মতো গহন মন আমাদের কয়জনেরই ছিল বলুন! তবে কী জানেন? যে পূর্ববঙ্গের মাটি হারানোর ঝিনুক যন্ত্রণায় আপনি নিরন্তর দগ্ধ হয়েছিলেন– আজকে তার পরিণতি দেখলে আপনি বিলক্ষণ ততোধিক বিদ্ধ হতেন। আজ আপনার জন্ম শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলির আলাপে সেই প্রসঙ্গটি টানলে ভারাক্রান্ত হবেন কিনা ঠাহর হচ্ছে না। বেদনা গিলে আপনি তো নীলকণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। তাই ভরসা করে আপনাকে কিছু তথ্য দেওয়ার নিষ্ঠুরতা দেখাচ্ছি। আমাকে মার্জনা করবেন প্রিয়!
রাজশাহী ঘোড়ামারার মিয়াপাড়ায় আপনার পৈত্রিক যে ভিটে বাড়ি ছিল, তার চিহ্ন পর্যন্ত আজ আর অবশিষ্ট নেই। ২০২৪ এর আগস্টে সেই ভিটে বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাঁজরে বাজলো বুঝি! ওই বাড়িতে থেকে আপনি স্কুল কলেজে পড়েছেন। সাহিত্য পত্রিকা “অভিধারা” সম্পাদনা করেছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আর আপনি একসঙ্গে নাট্যচর্চা করেছেন। আপনার ভাইঝি, স্বনাম খ্যাত মহাশ্বেতা দেবী ওই বাড়িতে বেড়ে উঠেছিলেন। হাজারে বিজারে স্মৃতি আপনার ওই বাড়িটিকে ঘিরে। আপনাকে সান্ত্বনা দেবার ধৃষ্টতা আমার নেই প্রিয় ঋত্বিক। তারপরও বলছি শুনুন, তাতে যদি মনোবেদনা সামান্য থিতু হয়।
পঁচাত্তর পরবর্তী কোনো সরকারই আপনার পৈত্রিক ভিটা সংরক্ষণের সহানুভূতিটুকু দেখায়নি–এটি চরম সত্যি। ১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকার ওই জমি রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে ইজারা দিয়েছিল। ২০১৯ এর দিকে বাড়িটির কিছু অংশ ভেঙে গ্যারেজ করার অভিযোগে রাজশাহীবাসীর প্রবল প্রতিবাদের মুখে পড়ে কলেজকর্তৃপক্ষ। ২০২০ সালে বাড়িটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর ২০২৪ এ সেটাকে বুলডোজারের আঘাতে সম্পূর্ণ নিচিহ্ন করা হয়।
২০২৪ সালটি বাংলাদেশের জন্য এক অভিশপ্ত বছর। একই বছর এবং একই মাসে, যে বাড়ি থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল– যে বাড়ির প্রধান ব্যক্তিটি বাঙালিকে পাকিস্তানি শাসন-শোষণ থেকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের ডাক দিয়েছিলেন– বাংলাদেশ জন্মের সেই সূতিকাগার, ইতিহাসের এক অমূল্য স্মারক- ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের সেই বাড়িকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রিয় ঋত্বিক। জানি, আপনার পৈতৃকভিটা বিলীনের পাশাপাশি এই তথ্যেও আপনার বুকে ব্যথা আর ক্ষোভের অনুরণন উঠবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আপনি নিজে দারিদ্রতার ঘায়ে ম্রিয়মান থাকা সত্ত্বেও শরণার্থীদের জন্য চাঁদা তোলার জন্য পথে নেমে ছিলেন। সেই দেশের স্বাধীনতার মহানায়ক, ইতিহাসের অমূল্য সম্পদের অবমাননা আপনার বুকে বাজবে বইকি! আপনি যে সত্যিকার একজন প্রতিবাদী মানুষ। কিন্তু আপনার পূর্ববঙ্গ, অর্থাৎ আমার বাংলাদেশে এমন প্রতিবাদী মানুষ একজনও নেই। তাই প্রতিবাদ ওঠে না। একাত্তর আমাদের সাহসী বুদ্ধিজীবীদের কেড়ে নিয়েছে। বর্তমানের সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহলে কেউ বুঝি জীবিত নেই, সেখানে তাই মৃতের নীরবতা। আপনার মতো করে কেউ বলবার সাহস রাখে না– হল্ট! ‘বিক্ষুব্ধ সময়ে মুজরো’ -দেখছো?
১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বরে আপনি জন্ম নিয়েছিলেন। এ বছরের নভেম্বরে আপনার এক’শ বছর পূর্ণ হবে। কিন্তু মৃত্যু নামের স্থিরচিত্র আপনাকে পঞ্চাশেই আটকে রাখবে। আপনার জন্ম শতবার্ষিকী ঘিরে কতশত আয়োজন চলছে, সেসব কি আপনি জানেন! এসব উদযাপনের বহু আগেই ভিনদেশে আপনাকে নিয়ে বহু আয়োজন হয়ে গেছে। হার্ভার্ড ফিল্ম আর্কাইভ এমনই এক আয়োজন করেছিল ২০২১ এর এপ্রিলে। জানি ওসব নিয়ে আপনার মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু ওদের আয়োজন নিয়ে খানিকটা শোনাতে যে আমার বড় ইচ্ছে হচ্ছে। সেই প্রোগ্রামের শিরোনাম ছিল- “High Passion: The Films of Ritwik Ghatak”-- তার বিবরণ পড়তে গিয়ে চোখ ভরে ওঠে প্রিয় ঋত্বিক। সে জল কতটা গর্বের আর কতটা নিজেদের দীনতাকে স্বীকার করে নেবার অসহায় আত্মসমর্পণের, জানি না। সেখানে লেখা হয়েছিল– “১৯৭৬ সালে মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে মৃত্যুর পর থেকে ঋত্বিক ঘটককে পরবর্তী যুগের ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর উজ্জ্বল ও তীক্ষ্ণ চলচ্চিত্রসমূহ সমকালীন ভারতীয় শিল্পের সবচেয়ে বিপ্লবী সৃষ্টিগুলোর মধ্যে অন্যতম। রাজনীতি ও গণনাটকের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে যুক্ত থাকার ফলেই ঘটক চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তুর সঙ্গে যুক্ত করার সংকল্প করেছিলেন। তিনি জনপ্রিয় অনুষঙ্গ মেলোড্রামা, গান, নৃত্যকে রূপান্তরিত করেছিলেন র্যাডিকাল রাজনৈতিক প্রকাশের উপযুক্ত বাহনে।
তাঁর প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রই একপ্রকার আত্মজীবনী। ঋত্বিক ঘটক বেড়ে ওঠেন ১৯৪০-এর দশকের ভয়াবহ আলোড়নের ভেতর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৪ সালের "মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ", স্বাধীনতার সময়কার সাম্প্রদায়িক হানাহানি, এবং বিশেষ করে বাংলা বিভাজন, যা তাঁর সমগ্র জীবনজুড়ে তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু প্রায়শই গৃহহীন ও উৎখাত হওয়া মানুষের জীবন থেকে নেওয়া: অনাথ শিশু, আশ্রয়হীন পরিবার, দিশেহারা উদ্বাস্তু, এবং নির্বাসনের ফলে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ঘিরে আবর্তিত।
রবার্ট ব্রেসনের নিয়তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মতো, ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রেও অন্ধকারতম মুহূর্তগুলোর মধ্যেও এক ঝলক আশার আলো দেখা যায়। সমালোচকদের মধ্যে তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। ঋত্বিক ঘটকের একটি চলচ্চিত্রও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বিতরণের জন্য পাওয়া যায় না; না চলচ্চিত্রহিসেবে, না ভিডিওহিসেবে। এই অবহেলিত শিল্পগুরুর কাজ আবিষ্কারের বিরল সুযোগটি গ্রহণ করার জন্য আমরা আপনাকে আমন্ত্রণ জানাই।”[অনুবাদ- লেখক]
চলচ্চিত্রকারদের গুরু হিসেবে মান্য করা হয় এখন আপনাকে। আপনার সমসাময়িক দুজন তাবড় বাঙালি পরিচালকের দোপদুরস্ত চৌকস উপস্থিতিতে আপনার মলিন পাজামা পাঞ্চাবি চোখে না পড়লেও মৃত্যু পরবর্তীতে আপনার কাজগুলো যেন বড়বেশি প্রাসঙ্গিক আর রত্নতুল্য হয়ে নিরন্তর আপনার উপস্থিতি জানান দিয়েছে। আজ আমরা বলি, আপনি ছিলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকারদের একজন। আজ আমরা আপনার সিনেমা নিয়ে গবেষণা করি, উৎসবে প্রদর্শন করি, বই লিখি। কিন্তু আপনি তো চেয়েছিলেন শুধু একটুখানি বোঝাপড়া, জীবদ্দশায় নূন্যতম শ্রদ্ধা। সেটুকুও আমরা দিতে পারিনি।
আপনার চলচ্চিত্রে আমরা দেখি এক জাতির আত্মা। উৎখাত, ভাঙা, অথচ বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আপনার নীতা, আপনার সীতা, আপনার শঙ্কর; তারা আমাদেরই প্রতিবিম্ব। আপনি পুরাণকে টেনে এনেছিলেন বর্তমানের রক্তাক্ত মাটিতে। আপনি সিনেমাকে বানিয়েছিলেন অস্ত্র- প্রতিবাদের, প্রেমের, বেদনার।
আপনার আগে, ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সাহিত্যে দেশভাগের চিত্রণ হিসেবে আমরা কী দেখেছি? সেখানে মূলত দেখা গেছে পাঞ্জাব বিভাজনের ভয়াবহতা- যা প্রায়শই ছিল লাহোর ও নয়াদিল্লির মধ্যে চলাচলকারী মৃতদেহভর্তি ট্রেনের- গণহত্যার দৃশ্যাবলী। জীবিতের সংক্ষুব্ধ সংগ্রাম সেখানে ছিল অনুপস্থিত। আপনিই সেই চলচ্চিত্র স্রষ্টা, যিনি বাংলার প্রেক্ষাপটে দেশভাগের অভিঘাতে বেঁচে থাকা শরণার্থীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সেলুলয়েড বন্দি করেন। আপনার সিনেমার প্রধান চরিত্রগুলো ছিলেন সেই ভাঙনের ভুক্তভোগী জীবন্ত মানুষ। সমাজ যাদের কেবল নিংড়ে নিয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে কিছুই দেয়নি। তবুও, তারা টিকে থাকার এক অদম্য মানবিক প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত হয়েছে। আপনি নিজেও কী তাই ছিলেন না প্রিয় ঋত্বিক! আর সেকারণেই পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও চলাচলের প্রতিটি স্তরের ভাঙনে আপনি নিজেও বার বার ভেঙেচুরে গেছেন। তারপরও আপসের পথে আপনি হাঁটেননি। এক্ষেত্রে বরাবরই আপনি চাঁছাছোলা, “আমৃত্যু আমার জীবনে কম্প্রোমাইজ করা সম্ভব নয়। সম্ভব হলে তা অনেক আগেই করতাম এবং ভালো ছেলের মতো বেশ গুছিয়ে বসতাম। কিন্তু তা হয়ে উঠল না, সম্ভবত হবেও না। তাতে বাঁচতে হয় বাঁচব, না হলে বাঁচব না। তবে এইভাবে শিল্পকে কোলবালিশ করে বাঁচতে চাই না।” পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার বানোয়াট ঐক্যের চিত্র তুলে ধরতে আপনার বিবেক সায় দেয়নি। এমন অমূল্য রত্নকে আমরা কত অবহেলায় হাতগ’লে অসময়ে পতিত হতে দিয়েছি। আমাদের সেই হীনতা-দীনতা নিয়ে ‘যুক্তি-তর্ক আর গপ্পো’ হয়তো হতে পারে– কিন্তু তাতে আপনার প্রতি আমাদের অবহেলা তামাদি হবার নয়।
আজ আমরা সাত মহাদেশ এক করলেও আপনাকে আর পাবো না। তবু আমরা চাই, আপনি আমাদের ক্ষমা করুন। আমাদের মেধাহীনতা, আমাদের নীরবতা, আমাদের অবহেলা, সব ভুলের জন্য ক্ষমা চাই। আমরা চাই, আপনার সেই চাবুকের শব্দ আমাদের ঘুম ভাঙাক। চাই নতুন প্রজন্ম নিজের শেকড়ের সন্ধানে সৎ হোক- ভাবুক, ক্ষমতার দাপট দেখানেওয়ালাদের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করতে শিখুক- করুক। রাষ্ট্র-সমাজ বদলের ভণ্ডামি নয়- সত্যিকার বদল আনার মিছিলের অংশ হোক- প্রতিবাদ করুক আপনার মতো করে। তাদের আপসকামীতা আর প্রশ্নহীনতার মগ্ন চৈতন্যে আপনি বার বার hammer করে বুঝিয়ে দিন, কেন প্রশ্ন করা প্রয়োজন। কোথায় প্রশ্ন করা জরুরি!
পৃথিবী জুড়ে আজ শুভবুদ্ধির মানুষেরা উদ্বাস্তু সম। তাদের মিছিলে আপনাকে বড় প্রয়োজন ছিল, প্রিয় ঋত্বিক। উদ্বাস্তু মানুষের প্রতি আপনার যে আজন্মের দরদ। জানি সম্ভব নয়- তবুও বোকাটে এই মন খুব করে চায়- আপনি, আপনার রাগ, বেদনা আর প্রতিবাদের ভাষা জড়ো করে একবারটি বলে উঠুন– “Cinema for me is nothing but an expression. It is a means of expressing my anger at the sorrows and sufferings of my people.”
শতবর্ষ পূর্ণের মাহেন্দ্রক্ষণে, আপনার প্রতি সশ্রদ্ধ কুর্নিশ-ভালোবাসা। আপনি নিরন্তর আমাদের আত্মবিস্মৃত চেতনায় হইসেল হয়ে বাজতে থাকুন, প্রিয় ঋত্বিক।
প্রিয় ঋত্বিক
▮ নাহার তৃণা
▮ নাহার তৃণা




ঋত্বিক ঘটক, শুধুমাত্র চলচ্চিত্র স্রষ্টা হিসেবে নন, একজন সৎ-একরোখা, জন্মভূমি প্রিয় মানুষ হিসেবে আমার ভীষণ শ্রদ্ধা-ভালোবাসার মানুষ। তাঁর শতবর্ষ নিয়ে এই লেখাটি এর আগে দুই জায়গা থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। যে মানুষ তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তুর সঙ্গে যুক্ত করার সংকল্পে অনড় থাকতেন। তাঁকে নিয়ে লেখার সূত্রে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির দগদগে ঘা দেখানো কি অন্যায়? যে অন্যায়ের কারণে ভীত সম্পাদকেরা এটি প্রকাশে ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু এর লেখক হিসেবে আমার ভেতরে একটা অপরাধবোধ জমা হয়েছিল; মানুষটাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে গিয়ে কোথাও অপমানে বিদ্ধ করে ফেললাম না তো! 'বিন্দু' আমায় ব্যক্তিগত সেই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিলো! আমি নিশ্চিত, আমাদের বাক্ স্বাধীনতার বাঁধাহীন(!) উল্লাস দেখে মেঘে ঢাকা তারাটি স্বভাবসুলভ হাসি হাসছেন। 'বিন্দু'কে সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ-ভালোবাসা।
উত্তরমুছুন