ওই কারখানা-তল্লাটে দমকলের ঘণ্টার ওই কান-ফাটানো আওয়াজের মধ্যেও নৈশপ্রহরীরা দিব্যি অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। কেন বলুন তো? কীভাবেই বা সম্ভব? কারণ হলো গিয়ে, ওই রাবণ গ্যাং-এর সঙ্গে ওদের তলে তলে একটা রফা হয়েই ছিল। গ্যাং-এর পাণ্ডারা কবে চড়াও হবে সেই খবরটা পেলেই, ওরা কড়া ঘুমের ওষুধ গিলে নিজেদের খাটিয়াগুলো গুদামের দালান থেকে বেশ খানিকটা তফাতে সরিয়ে নিয়ে যেত। এতে ওই গুণ্ডাদেরও আর দাঙ্গাহাঙ্গামা করতে হতো না, আর দারোয়ানদেরও ওই ছিঁটেফোটা মাইনের সঙ্গে কিছু বাড়তি রোজগারও হয়ে যেত। ব্যবস্থাটা যেমন বন্ধুত্বপূর্ণ, তেমনি বেশ বুদ্ধিমানেরও বটে।
ঘুমন্ত নৈশপ্রহরীদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মিস্টার কেমাল, আমার বাবা আর এস. পি. বাট দেখলেন, পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া সাইকেলগুলো ঘন কালো মেঘের রূপ ধরে আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে। দমকলের ইঞ্জিনগুলোর ঠিক পাশেই বাট, বাবা ও কেমাল দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর তাঁদের বুক চিরে যেন স্বস্তির এক জোয়ার বয়ে গেল, কারণ যে গুদামঘরটায় আগুন জ্বলছিল সেটা ছিল অর্জুন ইন্ডিয়াবাইক-এর গুদাম—হিন্দু পুরাণের এক বীরের নাম থেকে ধার করা অর্জুন ব্র্যান্ড-নামটা এই সত্যিটাকে কিছুতেই আড়াল করতে পারেনি যে ওই কোম্পানিটার আসল মালিক ছিল একজন মুসলমান। সেই স্বস্তির জোয়ারে গা ভাসিয়ে বাবা, কামাল আর বাট বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছিলেন, যে বাতাসে তখন কেবল জ্বালিয়ে-দেওয়া সাইকেলের গন্ধ। আর তার চোটে তাঁরা খুকখুক করে কাশছিলেন, বিষম খাচ্ছিলেন, কারণ পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া চাকার ধোঁয়া, চেইন, ঘণ্টি, সিটের পেছনের ব্যাগ আর হ্যান্ডেলের বাষ্প হয়ে যাওয়া ভূত, আর অর্জুন ইন্ডিয়াবাইকের আকার-বদলে-যাওয়া কাঠামোগুলো ক্রমাগত তাঁদের ফুসফুসের ভেতর ঢুকছিল আর বেরোচ্ছিল। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা গুদামঘরটার ঠিক সামনেই একটা টেলিগ্রাফের খুঁটির গায়ে পেরেক দিয়ে কার্ডবোর্ডের তৈরি একটা বিদঘুটে মুখোশ আঁটা ছিল—অনেকগুলো মুখওয়ালা একটা মুখোশ—চওড়া কোঁকড়ানো ঠোঁট আর টকটকে লাল নাকের ফুটো নিয়ে দাঁত-খিঁচিয়ে-থাকা এক শয়তানের মুখোশ। বহু-মাথাওয়ালা রাক্ষস, রাক্ষসরাজ রাবণের সেই মুখগুলো যেন ওপর থেকে রাগে গজরাতে গজরাতে ওই নৈশপ্রহরীদের শরীরগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল, যারা এমন অঘোরে ঘুমোচ্ছিল যে দমকলের লোক, কামাল, বাট বা আমার বাবা—কারও মনেই তাদের ওই ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানোর মতো বিন্দুমাত্র জোর ছিল না; আর ওদিকে আকাশ থেকে তখন তাদের গায়ের ওপর সাইকেলের প্যাডেল আর ভেতরের টিউবের ছাই ঝরে ঝরে পড়ছিল।
‘খুবই জঘন্য কারবার,’ মিস্টার কেমাল বললেন। তিনি কিন্তু মোটেই কোনো সহানুভূতি দেখাচ্ছিলেন না। তিনি আসলে ওই অর্জুন ইন্ডিয়াবাইক কোম্পানির মালিকদেরই মুণ্ডুপাত করছিলেন।
ওই দেখুন: এই সর্বনাশের (যা একইসঙ্গে আবার একটা স্বস্তিরও ব্যাপার বটে) কালো মেঘটা ওপরে উঠে গিয়ে ওই ফ্যাকাসে সকালের আকাশে কেমন একটা বলের মতো দলা পাকিয়ে উঠছে। দেখুন, কেমন করে ওটা পশ্চিম দিকে পুরোনো শহরের একেবারে বুকের ভেতর ধেয়ে যাচ্ছে; কেমন করে ওটা, হে ঈশ্বর, একটা আঙুলের মতো ইশারা করে ঠিক চাঁদনি চকের কাছের ওই মুসলিম মহল্লাটার দিকেই তাক করে আছে! ...যেখানে, ঠিক এই মুহূর্তে, সিনাইদের নিজেদের গলিতেই লিফাফা দাস গলা ফাটিয়ে তার পসরার হাঁক পাড়ছে।
‘দেখো দেখো… সব দেখো, দুনিয়া দেখো, আও আও…!’
এবার সেই প্রকাশ্য ঘোষণার সময় প্রায় ঘনিয়ে এল। উত্তেজনা যে হচ্ছে না তা নয়, অস্বীকার করছি না: আসলে নিজের এই গপ্পের আড়ালে-আবডালে বড্ড বেশি দিন ধরে ঘাপটি মেরে আছি কিনা, তবু জানিয়ে রাখি, এই দাস্তানের রাশ নিজের হাতে তুলে নেওয়ার আগে এখনও কিছু সময় বাকি আছে, এই ফাঁকে একটু উঁকিঝুঁকি মারতে বেশ লাগছে। তাই, বুকভরা একরাশ প্রত্যাশা নিয়ে, আমি আকাশের ওই ইশারা-করা আঙুলটার পিছু নিই আর ওপর থেকে আমার বাবা-মায়ের সংসার পাতা সেই মহল্লাটার দিকে চোখ রাখি; নজর রাখি সাইকেলগুলোর ওপর, কাগজের ঠোঙায় মুড়ে ভাজা ছোলা বেচতে-থাকা রাস্তার ফেরিওয়ালাদের ওপর, কোমর-বেঁকিয়ে-দাঁড়ানো আর হাতে-হাত-ধরে-থাকা রাস্তার ওই বখাটেদের ওপর, বাতাসে উড়তে-থাকা ছেঁড়া কাগজের টুকরো আর মিষ্টির দোকানগুলো ঘিরে ভনভন করতে-থাকা মাছির ছোটো ছোটো দলগুলোর ওপর... আর আকাশের এত উঁচুতে থাকা আমার এই নজরদারি থেকে সে-সবকিছুকেই কেমন যেন খাটো আর ছোটো দেখাচ্ছিল। সেখানে বাচ্চারাও ছিল, একেবারে দলে দলে, লিফাফা দাসের ডুগডুগির সেই জাদুকরি আওয়াজ আর তার ওই হাঁক শুনে রাস্তায় নেমে এসেছিল, ‘দুনিয়া দেখো’, গোটা দুনিয়া দেখে যাও! হাফপ্যান্ট-না-পরা ছেলে, জামা-না-পরা মেয়ে, আর তাদের চেয়েও একটু ফিটফাট অন্যান্য বাচ্চারা যারা স্কুলের সাদা পোশাকে সেজে আছে, ইংরেজি এস-এর মতো সাপের-মুখ-দেওয়া বকলস-আঁটা ইলাস্টিকের বেল্ট দিয়ে তাদের হাফপ্যান্টগুলো আটকানো, থলথলে আঙুলওয়ালা গুবলু-গাবলু খুদে ছেলের দল; সবাই চাকায়-বসানো কালো রঙের ওই বাক্সটার চারপাশে ভিড় জমাচ্ছে। তাদের দলেই রয়েছে এক বিশেষ মেয়ে, এমন এক মেয়ে যার দুটো চোখের ওপর ছায়া ফেলে রেখেছে একটা টানা, লম্বা আর লোমশ জোড়া-ভুরু, সেই একঘরে বদমেজাজি সিন্ধি লোকটার আট বছরের মেয়ে, যে কিনা ঠিক এই মুহূর্তেই নিজের বাড়ির ছাদে এখনও-বাস্তবে-না-থাকা দেশ পাকিস্তানের ঝান্ডা ওড়াচ্ছে, যে ঠিক এখনই তার প্রতিবেশীকে যাচ্ছেতাই বলে গাল পাড়ছে; আর ঠিক সেই সময়েই তার মেয়ে হাতের মুঠোয় একটা চবন্নি বা চার আনার সিকি নিয়ে রাস্তায় ছুটে আসছে, তার মুখে একটা পুঁচকে রানির মতো হাবভাব, আর ঠোঁটের ঠিক পেছনেই ওঁত পেতে আছে এক ভয়ানক খুনে মেজাজ। ওর নাম কী? আমি জানি না; কিন্তু আমি ওর ওই ভুরুদুটোকে খুব ভালো করেই চিনি।
লিফাফা দাস: যে কিনা নেহাতই কপাল-দোষে তার কালো বায়োস্কোপের বাক্সটা এমন একটা দেয়ালের গায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যার ওপর কে যেন একটা স্বস্তিকা এঁকে রেখেছে (সেকালে ওগুলো সব জায়গাতেই দেখা যেত; ওই উগ্রপন্থী আর.এস.এস.এস. পার্টি সব দেওয়ালে ওগুলো এঁকে রাখত; না না, নাৎসিদের ওই উল্টো স্বস্তিকা নয়, এ হলো গিয়ে হিন্দুদের সেই আদি শক্তির চিহ্ন। সংস্কৃতে ‘স্বস্তি’ মানে তো মঙ্গল বা ভালো...)। এই লিফাফা দাস, যার আসার খবর আমি এতক্ষণ ধরে ঢাকঢোল পিটিয়ে বলে আসছি, সে ছিল এমন এক ছোকরা, হাসলেই যাকে ভারী সুন্দর দেখাত, আবার না-হাসলে যাকে সেভাবে চোখেই পড়ে না, কিন্তু যখন সে তার ডুগডুগি বাজাত, তখন বাচ্চাদের কাছে তাকে কিছুতেই এড়ানোর উপায় থাকত না। ডুগডুগিওয়ালা: গোটা হিন্দুস্তান জুড়ে তারা হাঁক পাড়ে, ‘দিল্লি দেখো’, ‘দিল্লি দেখে যাও!’ কিন্তু এটা তো খোদ দিল্লি শহর, আর তাই লিফাফা দাস সেইমতো নিজের হাঁকটাকে খানিক পালটে নিয়েছিল। ‘সারা দুনিয়া দেখো… আও আও, সবকুছ দেখে যাও!’ বেশ কিছুকাল পর এই বাড়িয়ে-বলা বুলিটা তার নিজের মগজেই যেন একটা ঘোরের মতো চেপে বসল; নিজের দেওয়া কথা রাখার এক মরিয়া চেষ্টায়, সবকিছুকে ওই একটা বাক্সের ভেতর পুরে ফেলার তাগিদে তার ওই বায়োস্কোপের ভেতর একের পর এক তামাম দুনিয়ার হরেক রকম ছবির পোস্টকার্ড ঢুকতে শুরু করল। (হঠাৎ করেই আমার নাদির খানের সেই চিত্রকর বন্ধুটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে: গোটা বাস্তব দুনিয়াটাকে একটা গণ্ডির ভেতর পুরে ফেলার এই যে অদম্য তাগিদ, এটা কি তা হলে একটা ভারতীয় রোগ? তার চেয়েও বড়ো কথা: আমি নিজেও কি এই রোগে আক্রান্ত?)
লিফাফা দাসের ওই বায়োস্কোপের ভেতর ছিল তাজমহল, মীনাক্ষী মন্দির আর পবিত্র গঙ্গার ছবি; কিন্তু এই নামজাদা দর্শনীয় জায়গাগুলোর পাশাপাশি ওই বায়োস্কোপওয়ালা একেবারে এ-কালের আরও কিছু ছবি সেখানে রাখার প্রবল তাগিদ অনুভব করেছিল—নেহরুর বাসভবন থেকে স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের বেরিয়ে আসার দৃশ্য; সমাজের অস্পৃশ্যদের ছোঁয়ার দৃশ্য; রেললাইনের ওপর দলে দলে শিক্ষিত মানুষদের শুয়ে থাকা; মাথায় ফলের এক পেল্লায় পাহাড় চাপানো এক ইউরোপীয় অভিনেত্রীর প্রচারের কাজে ব্যবহার করা একটা স্থিরচিত্র—লিফাফা তাকে ডাকত ‘কারমেন বারান্দা’ বলে; এমনকী কার্ডবোর্ডের ওপর সাঁটানো শিল্পাঞ্চলে আগুন লাগার একটা খবরের কাগজের ছবি পর্যন্ত তার মধ্যে ছিল। লিফাফা দাস তার দর্শকদের এই জমানার ‘সবসময়-সুখকর-নয়’ এমন চেহারাগুলো থেকে আড়াল করে রাখায় মোটেও বিশ্বাসী ছিল না... আর প্রায়শই, যখন সে এই গলিঘুঁজিগুলোতে এসে হাজির হতো, তখন বাচ্চাদের পাশাপাশি বড়োরাও তার ওই চাকায়-বসানো বাক্সের ভেতর নতুন কী এসেছে তা দেখতে ভিড় জমাত, আর তার সবচেয়ে বাঁধা খদ্দেরদের মধ্যে একজন ছিলেন স্বয়ং বেগম আমিনা সিনাই।
কিন্তু আজকের বাতাসটা কেমন যেন একটু অন্যরকম, কেমন একটা হিস্টিরিয়াগ্রস্ত ভাব; মাথার ওপর ছাই-হয়ে-যাওয়া ইন্ডিয়াবাইকগুলোর মেঘটা জমতেই গোটা মহল্লার ওপর যেন একটা ঠুনকো, ভয়ংকর থমথমে ভাব এসে চেপে বসেছে... আর ঠিক তখনই যেন তার শিকলটা ছিঁড়ে গেল, যখন জোড়া-ভুরুওয়ালা সেই মেয়েটা তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠল। তার আধো-আধো গলায় এমন একটা ভান-করা মাসুমিয়ত ঝরে পড়ল যা তার ভেতরে বিন্দুমাত্র ছিল না, ‘আমি পত্তমে! পথ ছালো বলছি... আমাকে দেকতে দাও! আমি দেকতে পাচ্চি না!’ কারণ বাক্সটার ফুটোগুলোতে এর মধ্যেই আরও অনেক চোখ সেঁটে আছে, একের পর এক ঘুরে-চলা পোস্টকার্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে বাচ্চারা এর মধ্যেই একেবারে মশগুল হয়ে পড়েছে, আর লিফাফা দাস বলে উঠল (নিজের কাজ না-থামিয়েই—বাক্সের ভেতরের পোস্টকার্ড ঘোরানোর হাতলটা সে একনাগাড়ে ঘুরিয়েই চলল), ‘আর একটুখানি সময়, বিবি; সবাই নিজের সুযোগ পাবে; একটুখানি সবুর করো।’ এর জবাবে ওই জোড়া-ভুরুর পুঁচকে রানি পাল্টা বলে উঠল, ‘না! না! আমিই পত্তমে দেকবো!’ লিফাফা একটু কাঁধ ঝাঁকাল, সেইসঙ্গে তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল—আর তাতে সে যেন সাধারণ আড়ালে এক অলক্ষ মানুষ হয়ে গেল। পুঁচকে রানিটার মুখে তখন এক লাগামছাড়া রাগের আগুন। ঠিক তখনই একটা অপমান যেন ফুঁসে উঠল; তার ঠোঁটের ডগায় এক মারাত্মক বিষাক্ত তির যেন তিরতির করে কাঁপতে লাগল। ‘তোমার বুকের পাটা কম নয়, এই মল্লায় এসেচো! আমি তোমাকে চিনি: আমার আব্বাও তোমায় চেনে: সবাই জানে তুমি একজন হিন্দু!!’
লিফাফা দাস চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে নিজের বাক্সের হাতল ঘোরাতে থাকে; কিন্তু ততক্ষণে ঝুঁটি-বাঁধা আর জোড়া-ভুরুওলা ওই পুঁচকে রণরঙ্গিণী তার নাদুসনুদুস আঙুল উঁচিয়ে সুর করে চেঁচাতে শুরু করেছে, এবং স্কুলের সাদা পোশাক ও সাপের-ফণা-আঁকা বকলস পরা ওই ছেলেগুলোও তার সঙ্গে গলা মেলাল: ‘হিন্দু! হিন্দু! হিন্দু!’ ওদিকে সব জানলার বেতের চিকগুলো খটাখট ওপরে উঠে যাচ্ছে; আর মেয়েটার বাবাও নিজের জানলা দিয়ে ঝুঁকে পড়ে তাদের দলে ভিড়ে গিয়ে এক নতুন লক্ষ্যের দিকে গালাগাল ছুড়তে শুরু করেছে, আর ওই বাঙালি লোকটাও তার ভাষায় ধুয়ো ধরল... ‘ওরে জানোয়ার! আমাদের মেয়েদের ইজ্জত লুটেরা!’... মনে রাখবেন, খবরের কাগজে তখন মুসলিম বাচ্চাদের ওপর হামলার খবর নিয়ে জোর চর্চা চলছিল, তাই আচমকা একটা গলা তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল—একজন মহিলার গলা, হয়তো সেই বেকুব জোহরারই হবে, ‘ধর্ষক! আরে খোদা, ওই তো সেই বদমাশটাকে পাওয়া গেছে! ওই তো ও!’ আর ঠিক তখনই ইশারা-করা আঙুলের মতো সেই মেঘের পাগলামি এবং ওই সময়টার একেবারে খাপছাড়া অবাস্তবতা গোটা মহল্লাটাকে যেন জাপটে ধরল। প্রতিটা জানলা থেকে চিৎকার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, আর ওই ইস্কুলের ছেলেগুলো না-বুঝেই তালে তালে চেঁচাতে শুরু করল, ‘ধর-ষক! ধর-ষক! ধর-ধর-ধর-ষক!’ বাচ্চারা লিফাফা দাসের কাছ থেকে একটু পিছিয়ে গেছে, আর সে-ও চাকায়-বসানো তার বাক্সটা টেনে নিয়ে একটু একটু করে সরে গিয়ে পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে; কিন্তু এখন সে রক্তপিপাসু অজস্র গলার চিৎকারে একেবারে ঘেরা পড়েছে, রাস্তার ওই বখাটের দল তার দিকে তেড়ে আসছে, সাইকেল থেকে লোকজন নেমে পড়ছে, বাতাস চিরে উড়ে-আসা একটা হাঁড়ি তার ঠিক পাশের দেয়ালে আছড়ে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে একটা দরজার ওপর পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর ঠিক তখনই তেলতেলে চুলের ঝুঁটিওয়ালা একটা লোক তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, ‘কী হে, বাবু: তা হলে তুমিই সেই? মিস্টার হিন্দু, যে আমাদের মেয়েদের নষ্ট করে? মিস্টার মূর্তিপূজারী, যে কিনা নিজের বোনের সঙ্গে শোয়?’ আর লিফাফা দাস, ‘আজ্ঞে না, দোহাই আপনাদের…’, বলে বোকার মতো হাসতে লাগল... আর ঠিক তখনই তার পেছনের দরজাটা খুলে গেল ও সে ছিটকে উলটে গিয়ে পড়ল একটা অন্ধকার, ঠান্ডা লম্বা দালানে—একেবারে আমার মা আমিনা সিনাইয়ের পাশে।
সকালটা জোহরার খিলখিলে হাসি আর বাতাসে ভাসমান রাবণ নামের প্রতিধ্বনির সঙ্গেই কেটেছিল তাঁর। বাইরে শিল্পাঞ্চলের দিকে কী প্রলয় চলছে, তার কিছুই জানা ছিল না; শুধু মনে হচ্ছিল, গোটা দুনিয়াটাই বোধহয় পাগল হয়ে গেছে। তারপর যখন চিৎকার শুরু হলো এবং জোহরাও তাতে গলা মেলাল, ঠিক তখনই তাঁর বুকের ভেতরটা কেমন যেন শক্ত হয়ে গেল। তিনি যে কার মেয়ে, সেই বোধটা চাগাড় দিয়ে উঠল ভেতরে ভেতরে; মনে পড়ে গেল নাদির খানের সেই ভুতুড়ে স্মৃতি—বাঁকা ছোরার ভয়ে জংলি ক্ষেতে লুকিয়ে থাকা। নাকের ভেতর একটা অদ্ভুত অস্বস্তি নিয়ে তিনি সোজা নিচে নেমে গেলেন কাউকে বাঁচাতে। জোহরা অবশ্য সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছিল, ‘ও কী করছ বেহেনজি? ওই তো একটা ক্ষ্যাপা জানোয়ার, দোহাই আল্লার, ওকে ঘরে ঢুকতে দিও না, তোমার মগজে কি পোকা ধরল নাকি?’... মা দরজাটা খুলল, আর লিফাফা দাস হুমড়ি খেয়ে ভেতরে পড়ল।
সেই সকালবেলার দৃশ্যটা একবার চোখের সামনে ভাবুন দেখি। একদিকে ওই ক্ষ্যাপা ভিড়, আর অন্যদিকে তাদের শিকার—আর ঠিক মাঝখানটায় সে দাঁড়িয়ে, একখানা কালো ছায়ার মতো। তার পেটের ভেতর তখন সেই না-বলা অদৃশ্য গোপন সমাচারটা একেবারে ফেটে বেরোনোর জোগাড়। ‘বাঃ বাঃ!’ সে ওই ভিড়টাকে একেবারে তারিফ করে উঠল। ‘কীসব বীরপুরুষ গো তোমরা! ওরেব্বাস, সত্যিকারের সব বাহাদুর, কসম খোদার! মাত্র এই জনা পঞ্চাশেক লোক মিলে তোমরা ওই একখানা মস্ত দানবটার সঙ্গে লড়ছ! আল্লাহ! তোমাদের দেখে গর্বে আমার চোখ জুড়িয়ে গেল গো।’
... আর জোহরা চেঁচিয়ে উঠল, ‘ও সিস্টারজি, ফিরে এসো বলছি!’ আর সেই তেল-চুপচুপে চুলের ঝুঁটিওলা বলল, ‘এই গুণ্ডাটার হয়ে কেন সাফাই গাইছেন, বেগম সাহিবা? কাজটা কিন্তু আপনি ঠিক করছেন না।’ আমিনা বলল, ‘আমি লোকটাকে চিনি। ও নেহাতই ভালোমানুষ। যাও, ভাগো এখান থেকে, তোমাদের কারও কি কোনো কাজকর্ম নেই নাকি? একটা মুসলিম মহল্লার মধ্যে তোমরা একটা জ্যান্ত মানুষকে ছিঁড়েখঁড়ে ফেলবে নাকি? যাও, হটো এখান থেকে।’ কিন্তু ভিড়টার সেই থমকে-যাওয়া ভাবটা ততক্ষণে কেটে গেছে, আর তারা ফের সামনের দিকে এগোতে শুরু করেছে... আর ঠিক এই সময়েই। এবার সেই আসল কথাটা বেরিয়ে এল।
‘শোনো,’ আমার মা চেঁচিয়ে উঠল, ‘কান খুলে ভালো করে শুনে রাখো। আমার গর্ভে সন্তান। আমি মা হতে চলেছি, আর এই মানুষটাকে আমি আশ্রয় দিলাম। এবার এসো দেখি, যদি খুনই করতে চাও, তবে এই মাকেও খুন করে যাও—আর দুনিয়াশুদ্ধু লোককে দেখিয়ে দাও তোমরা কেমন সব পুরুষমানুষ!’
আর ঠিক এভাবেই ব্যাপারটা ঘটেছিল। আমার বাবা কিছু শোনার বা জানার আগেই, জড়ো-হওয়া ওই আমজনতার সামনে আমার আসার খবর—এই সালিম সিনাইয়ের আগমন-বার্তা—ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল। মনে হয়, মায়ের পেটে আসার ওই মুহূর্তটা থেকেই আমি একেবারে জনগণের সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিলাম।
তবে সবার সামনে ওই ঘোষণা করার সময় আমার মা যদিও ঠিক কথাই বলেছিল, তবু একইসঙ্গে সে একটা ভুলও করেছিল বটে। কারণটা বলি: যে বাচ্চাটাকে সে নিজের গর্ভে ধারণ করে ছিল, শেষমেশ সে তার নিজের ছেলে হয়ে উঠল না।
আমার মা দিল্লিতে এল; নিজের স্বামীকে ভালোবাসার জন্য মনপ্রাণ ঢেলে দিল; কিন্তু ওই জোহরা, ওই খিচুড়ি আর ওইসব হুড়মুড় করে ছুটে যাওয়া পায়ের আওয়াজ, ওই খটখট শব্দের চোটে স্বামীকে নিজের সুখবরটা আর জানিয়ে উঠতে পারল না সে; তারপর কানে এল ওই চিৎকার-চেঁচামেচি; আর সবার সামনে ওই ঘোষণাটা করে বসল। আর তাতে কাজও হলো। আমার আসার ওই খবরটাই একটা জ্যান্ত মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে দিল।
ভিড়টা পাতলা হয়ে গেলে ’পর, বুড়ো বেয়ারা মুসা রাস্তায় নেমে লিফাফা দাসের সেই বায়োস্কোপের বাক্সটাকে উদ্ধার করে আনল। ওদিকে আমিনা সেই সুন্দর-হাসিওয়ালা যুবককে গ্লাসের পর গ্লাস তাজা পাতিলেবুর শরবত খাইয়ে যেতে লাগল। মনে হচ্ছিল, ওই ভয়ংকর অভিজ্ঞতাটা তার শরীরের জলটুকু তো বটেই, এমনকী ভেতরকার সমস্ত মিষ্টতাটুকুও যেন একেবারে নিংড়ে নিয়েছে, কারণ সে প্রত্যেক গ্লাস শরবতেই চার-চার চামচ করে চিনি মিশিয়ে নিচ্ছিল। আর ওদিকে জোহরা তখন একটা সোফার ওপর ভারী সুন্দর এক ত্রস্ত ভঙ্গিতে ভয়ে সিঁটিয়ে বসে ছিল। তারপর, বেশ কিছুক্ষণ পর, লিফাফা দাস (লেবুর শরবতে তেষ্টা মিটিয়ে আর চিনির রসে শরীর জুড়িয়ে) বলে উঠল: ‘বেগম সাহিবা, আপনি সত্যিই এক মহান নারী। যদি অনুমতি দেন তো আমি আপনার এই ঘরকে আশীর্বাদ করে যাই; আশীর্বাদ করে যাই আপনার গর্ভের সন্তানকেও। কিন্তু আরও একটা কথা—দয়া করে আমাকে অনুমতি দিন—আমি আপনার জন্য আরও একটা কাজ করতে চাই।’
‘তোমাকে ধন্যবাদ,’ আমার মা বলল, ‘কিন্তু তোমাকে আর কিচ্ছুটি করতে হবে না।’
কিন্তু সে বলেই চলল (চিনির মিষ্টতা তখন তার জিভে রীতিমতো প্রলেপ দিয়েছে)। ‘বেগম সাহিবা, আমার এক তুতো ভাই আছেন—শ্রী রামরাম শেঠ—সে একজন মস্ত বড় ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। হাত দেখা, কোষ্ঠি বিচার, ভাগ্য গণনা—সবেতেই সে ওস্তাদ। দয়া করে আপনি একবারটি তাঁর কাছে চলুন, আপনার ছেলের ভবিষ্যতে কী লেখা আছে তা তিনি আপনার সামনে একেবারে খোলসা করে বলে দেবেন।’
জ্যোতিষীরা আমার আসার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল... ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাসে, একটা জ্যান্ত প্রাণ বাঁচানোর উপহার হিসেবে আমার মা আমিনা সিনাইয়ের কাছে একটা ভবিষ্যদ্বাণী শোনার প্রস্তাব এল। জোহরা যদিও মানা করেছিল, ‘ওর সঙ্গে যাওয়াটা কিন্তু স্রেফ পাগলামি হবে, আমিনা বুবু, এক মুহূর্তের জন্যও ও-কথা মাথায় এনো না, এখন দিনকাল ভালো নয়, খুব সাবধানে থাকতে হবে’; নিজের বাবার সেই সন্দিগ্ধ স্বভাব আর এক মৌলবির কান পাকড়ে ধরা তাঁর সেই বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর স্মৃতি মনে থাকা সত্ত্বেও, প্রস্তাবটা আমার মায়ের মনের এমন একটা জায়গায় গিয়ে নাড়া দিল যে ভেতর থেকে আপনাআপনিই একটা ‘হ্যাঁ’ বেরিয়ে এল। সবেমাত্র নিশ্চিত-হওয়া আনকোরা নতুন মাতৃত্বের এক যুক্তিহীন বিস্ময়ের ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে সে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, লিফাফা দাস, তুমি দয়া করে কয়েকদিন পর লালকেল্লার গেটের কাছে আমার সঙ্গে দেখা কোরো। তারপর তুমি আমাকে তোমার সেই ভাইয়ের কাছে নিয়ে চলো।’
‘আমি রোজ আপনার পথ চেয়ে বসে থাকব,’ দু-হাত জোড় করে সে বলল; তারপর চলে গেল।
জোহরা এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিল যে, আহমেদ সিনাই যখন বাড়ি ফিরল, সে কেবল মাথা নেড়ে বলতে পারল, ‘তোমরা এই নতুন-বিয়ে-করা বর-বউ; একেবারে প্যাঁচার মতো পাগল; তোমাদের এখন একে অন্যের ভরসাতেই ছেড়ে দেওয়া ভালো!’
বুড়ো বেয়ারা মুসাও নিজের মুখে একেবারে কুলুপ এঁটে রইল। সে আমাদের জীবনের একেবারে পেছনের সারিতেই চিরকাল নিজেকে আড়াল করে রাখত, সবসময়, কেবল দু-বার ছাড়া... একবার, যখন সে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল; আর একবার, যখন নেহাতই এক দুর্ঘটনার বশে দুনিয়াটাকে ধ্বংস করে দিতে সে ফিরে এসেছিল।
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য