অ্যাকাডেমিক জ্ঞান ও চাকরি
আমি পড়াতে ভালবাসি। এবং সেই ভালবাসা থেকেই শিক্ষকতাকে পেশা করেছি। কিছু সময় ছাড়া। দুবার দুটি ভিন্ন সময়ে কর্পোরেট-এ স্বল্প সময় চাকরি করা ছাড়া। অনেক সাধারণ বাঙালি মধ্যবিত্তের মতো পঠনপাঠনকে চিরকাল একটা সম্মানজনক পেশা হিসেবেই দেখেছি। আমাদের পরিবারে শিক্ষকতা নিয়ে একটা প্রচ্ছন্ন অহং ছিল। এখনও আছে। তবে আমার মা আমার শিক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধী ছিলেন। কারণ আমার বাবা। বাবাও শিক্ষক ছিলেন। আর সেই সময়ে শিক্ষকদের বেতন যে কতো কম ছিল আজকের প্রজন্ম নাও বুঝে উঠতে পারে! ফলে ঐ আয়ে সংসার চালানোর হ্যাপাটা তাঁকেই সামলাতে হতো! আমার অবস্থাটা অতো শোচনীয় হয় নি। মাইনে পত্র আগের থেকে অনেকটাই বেড়েছে সেই সময়ের নিরিখে। বাবার বনেদী গরীবত্ব আমাকে অতটা খেতে পারেনি। বাবার ক্ষেত্রে অসুবিধেটা একটু মারাত্মক রকমেরই ছিল। কারণ বাবা প্রাইভেট ট্যুইশন দিতেন না। যখন চাকরিক্ষম হলাম, বাবা শুধু একটি কথাই বলেছিলেন, দেখো, চাকরি মানে চাকরগিরি। যতো বেশি উন্নতি করা না কেন, শেষ পর্যন্ত সেটা চাকরেরই কাজ। ফলে ভাল চাকরি বলে কিছু হয় না। চেষ্টা করো যাতে সবচেয়ে কম খারাপ চাকরিটা খুঁজো। কথাটা আমার মনে ধরেছিল। ভেবে দেখলাম, অধ্যাপনাটাই সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ কোন বস নেই। বস ব্যাপারটাই বিরক্তিকর। আর কম যোগ্যতার লোক হলে, সে আরও ভয়ঙ্কর। এখনও আমার মতে একজন শিক্ষকের মূল দায়বদ্ধতা তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কাছে। আর ভাল পড়ালে শিক্ষক নিজেই তা ধরতে পারেন। এই তৃপ্তি টা অন্য কোন পেশায় এতটা আছে কিনা সন্দেহ। আর খারাপ পড়ালে, নিজের কাছেই ধরা পড়তে হয়। এবং সে বড় বিশ্রী ব্যাপার। teaching আর cheating দুটি শব্দই একই অক্ষরমালার অন্তর্গত।
আজীবন দেশে বিদেশে অধ্যাপনা করেছি এই গর্ব নিয়ে, আমি সত্যিই কিছু করছি সমাজের জন্যে। কিন্তু একটি ঘটনায় আমার সে বিশ্বাসে চিড় ধরল। সেই গল্পটি বলার জন্যেই এতো ভূমিকা। এমনিতেই শিক্ষকদের সম্পর্কে অতিকথনের দুর্নাম সর্বজনবিদিত। অবশ্য এটা বোধ হয় আমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য। অমর্ত্য সেনের Argumentative Indian এর প্রথম প্রবন্ধের শুরুই Prolexity শব্দটি দিয়ে। এ ব্যাপারে আমাদের সময় একটি বাজে গপ্প বাজারে চালু ছিল। কেউ যদি এক ঘন্টার আগে তাঁর বক্তৃতা শেষ করতে না পারে, ধরে নেওয়া যেতে পারে, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তেমনি, পঞ্চাশ মিনিট হলে, কলেজ শিক্ষক, ইত্যাদি!
তখন আমি উত্তর ভারতের একটি প্রতিষ্ঠানে পড়াই। সেখানে রেগুলার এমবিএ প্রোগ্রামের সাথে একটি এক্সিকিউটিভ এমবিএ প্রোগ্রামও ছিল। অন্তত ৫ বছরের কর্পোরেট অভিজ্ঞতা ছিল অ্যাডমিশনের ন্যূনতম যোগ্যতা। ১৮ মাসের রেসিডেনশিয়াল প্রোগ্রাম । কর্পোরেট ফাইনান্সের কোর্সটা আমি পড়াতাম। একটি নির্দিষ্ট ব্যাচের কথা বলছি। একটি ছাত্র ছিল যাকে আমি হাজার চেষ্টা করেও কিছু শেখাতে পারিনি। ধরা যাক, ছেলেটির নাম অমরিন্দর। মধ্য তিরিশ বয়েস। আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে তাকে আমার ক্যাবিনেও নিয়ে বসেছি। বহু পরিশ্রম করেছি। কিন্তু কিছুই করতে পারিনি। আমার শিক্ষকতা জীবনে একটি কলঙ্ক তো বটেই। কারণ ছাত্রের অসাফল্যের দায় তো শিক্ষকও এড়াতে পারেন না। মিড টার্ম ও এন্ড টার্ম দুটিতেই সে ফেল করে। কিন্তু ছেলেটি পরিশ্রমী ও যাকে বলে ওয়েব বিহেভড। আমি আমার ব্যর্থতা টা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। অমরিন্দর এক দিন সন্ধের দিকে একদিন আমার কাছে এলো। বলল, স্যার, আমি খুবই লজ্জিত। আমি কিন্তু অনেষ্টলি চেষ্টা করেছি। নাম্বারস আমার মাথায় থাকে না। তবে আপনার ক্লাস কিন্তু আমি খুবই এনজয় করেছি। আপনাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি’। আমার সত্যিই কষ্ট হচ্ছিল। আমাদের দু জনের জন্যেই। এটা তো আমার পক্ষেও দুঃখজনক। তবে, যাওয়ার আগে একটি কথা বলে গেলো, স্যার, I won’t disappoint you twice. I’m telling you, I’ll bag the first job offer in my batch। আমি কিছু বললাম না। কারণ এক্সিকুটিভ এমবিএ দের প্লেসমেন্ট একটু কঠিনই ছিল। ওদের lateral level- এ প্লেসমেন্ট হতে হতো। হাই বা অন্তত মিড লেভেল-এ। ওর ব্যক্তিগত ক্রাইসিস টা বুঝতে পারছিলাম।
পরের ট্রাইমেস্টার শুরু হবে। আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এই টার্মটা ছিল স্পেশালাইজেশনের। আমি ইক্যুইটি রিসার্চ কোর্সটি পড়াতাম। নামেই বোঝা যাচ্ছে বিষয়টা একটু বেশি টেকনিক্যাল। অঙ্ক-টঙ্ক একটু বেশিই আছে। এবং কোর ফিনান্সে একটা নির্দিষ্ট গ্রেডের নিচে থাকলে এই কোর্স নেওয়াও যাবে না। এটিই নিয়ম। আর মূলত এমবিএ-র ছেলেমেয়েরাই নেয়। প্রথম দিন ক্লাসে গিয়ে দেখি, অমরিন্দারও রয়েছে। আমি তো হতবাক। যাহোক, ক্লাসের শেষে, আমি ওকে ক্যাবিনে দেখা করতে বললাম। ও এলো। এবারে ভূমিকা ছাড়াই জিজ্ঞেস করলাম, তোমার তো এই কোর্সে রেজিস্টার করা সম্ভব নয়। তাহলে? ও ধীর গলায় জবাব, ইয়েস স্যার। না রেজিস্টারড নই। ইনফরমালি এসেছি। আমি যদি এভাবে আসি, তোমার কি কোন আপত্তি আছে? আমি বললাম, ব্যাপারটা আপত্তির নয় । নিয়মের ব্যাপারটা ছেড়ে দিলেও, ফিনান্স তো তোমার ইন্টারেস্টের জায়গা নয়, শুধু শুধু কেনই বা আসবে? ওর সরল জবাব, স্যার, আমার তোমার ক্লাস খুব ভাল লাগে। তোমার পড়ানো। এবারে আমি হেসে ফেললাম। ‘দেখো অমরিন্দার, ক্লাস তো একটা ফর্মাল জায়গা। আমাকে তো কিছু আইন কানুন মানতে হবে। আর তোমরও কিছুই শেখা হবে না। বরং যে কোর্সগুলো নিয়েছ, সেগুলো ভাল করে পড়। আমার কাছে তো যেকোনো সময়ই গল্প করতে আস্তে পারো। ও আর কিছু বলল না। থ্যাঙ্ক ইউ বলে চলে গেলো। তবে ওকে আর ক্লাসে দেখিনি। এমনিও আমার কাছে আর আসেনি।
কিছুদিন বাদে, লাঞ্চের একটু আগে আমার ক্যাবিনে ঠক ঠক। কাম ইন বলতেই ভিতরে ঢুকল অমরিন্দার। একদম ফর্মাল ড্রেস। টাই সুদ্ধ। আমাকে বাও করে বলল, স্যার, আজ আমার প্লেসমেন্ট হোল। বলেছিলাম না; আই ব্যাগড দ্য ফার্স্ট জব। আমি কনগ্রাটুলেট করলাম। মনে পড়ল, হ্যাঁ, আজই তো ওদের ব্যাচের প্লেসমেন্ট উইকের প্রথম দিন। এর মধ্যে জেনে গেছিলাম অন্য কলীগদের থেকে, অমরিন্দার স্বভাবে ভাল হলেও, কোন সাব্জেক্টেই ভাল করতে পারে নি। তবুও……. আর ওর সদ্য পাওয়া চাকরিটার প্যাকেজ নাকি দারুণ!
ও নিশ্চয়ই জীবনে, অনেক উপরে উঠেছে! তবে, আমার শিক্ষক হিসেবে অনেক ধারণা ঘেঁটে গেছে। প্রায় অনুরূপ ঘটনা পরেও প্রত্যক্ষ করেছি। নিজেকেই প্রশ্ন করে উত্তর পাইনি। পড়াশোনার সঙ্গে চাকরির কী যোগ, কিম্বা আদৌ কোন যোগ আছে কিনা, এ নিয়ে বিস্তর ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। সুকুমার রায়ের বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই ও অশিক্ষিত মাঝির কথোপকথন টা মনে পড়ে। কিম্বা কমল কুমার মজুমদারের সেই তির্যক মন্তব্যটাও; ‘ ব্যাঙের যে একটা লাতিন নাম আছে, ব্যাঙ কি সেটা জানে?’ গুন্তের গ্রাসের The Wicked Cook কবিতার শেষ দুটো লাইন দিয়েই উপসংহার টানিঃ
What we eat, the cooks dish out!
বাস্তু শাস্ত্র
বাস্তু শাস্ত্র বিষয়টার সঙ্গে আমার পরিচয় কলকাতা ছাড়ার পর। বিশেষত উত্তর ভারতে থিতু হবার পর। আর পৃথিবীর এই ভূখণ্ডে বাস্তুশাস্ত্রের মাহাত্ম্য সম্পর্কে প্রশ্ন করাটা একটা সামাজিক অপরাধ হিসেবেই চিহ্নিত। মানুষ এখানে ভীষণ ভাবেই বাস্তু মানেন। কলকাতার জলহাওয়ায় বড় হয়েছি। সুতরাং, আমাদের ধারণায় দক্ষিণ খোলা ঘরদোর হোল সবচেয়ে ভাল। ছোটবেলায় একটা ছড়া শুনতাম:
দক্ষিণ দুয়ারী ঘরের রাজাপূব দুয়ারী তাঁহার প্রজাপশ্চিম দুয়ারীর মুখে ছাইউত্তর দুয়ারীর কথা নাই।
মোদ্দা কথা হোল, পূব দক্ষিণ খোলা হলেই হোল! আর আমরা যারা ওপার বাংলা থেকে সব খুইয়ে এসেছি, তাদের আর কীসের ভয়! পছন্দ-অপছন্দের সুযোগ ই বা কতোটুকু ছিল? উদ্বাস্তুর আবার বাস্তু ভয়! তাই যখন একটু থিতু হবার সুযোগ পেয়েছি, পূব-দক্ষিণ ব্যাপারটাই মাথায় রেখেছি। অবশ্য এই বাস্তুর কল্যাণে বাস্তবে আমার কিছু উপকারও হয়েছে। যেমন, বাসা কেনার ক্ষেত্রে। বুক করতে গিয়ে দেখলাম, বাস্তু মানা মানুষজন বিল্ডিং-এর প্রতিটি ফ্লোরের শাস্ত্র মতে শুভ ফ্ল্যাটগুলো নিয়ে নিয়েছেন। ফলে পূব দক্ষিণের গুলো তখনও তেমন একটা বুকড হয়নি। অতএব, আমার পছন্দমতো ঘর কিনতে কোন অসুবিধেই হয়নি। মজার বিষয়, উত্তর ভারতে বেড়ে ওঠা বাঙালিদের বাস্তু-প্রেম কিন্তু একেবারেই এখানকার মতোই। একটা মজার গপ্প বলে নিই এই সুযোগে।
একটি পরিবার যারা ইলাহাবাদে ক’ পুরুষ আছেন বাস্তু-সম্মত একটি ফ্ল্যাটই কিনেছেন ফিফথ ফ্লোরে।। ওঁদের সঙ্গে আমার কিছু যাতায়াত ছিল। খুব ভাল মানুষ ছিলেন ওঁরা। একমাত্র অদ্ভুত বাংলা বলা ছাড়া আর সব ঠিকঠাক। ওঁদের ছেলে পার্থ। আমার থেকে বেশ খানিকটা ছোট। আমাকে দাদা বলত। এখনও বলে। তো একদিন আঁধি শুরু হয়েছে সন্ধের পরে। আমাদের বিশ তলা বিল্ডিং কম্পমান। দিল্লি অঞ্চলের আঁধি খুবই তেজী ও ভয়ঙ্কর। এবং এ ধুলোর ঝড় পশ্চিম দিক থেকেই আসে। আঁধির ধাক্কা বাস্তবিকই প্রকৃতির এক প্রবল গুণ্ডামি। পশ্চিম দিকের এপার্টমেন্টগুলোতে সরাসরি আঘাত করে। সেদিন সত্যিই একটু বেশিই তেজী সে। হঠাৎ ইন্টারকমে ফোন। পার্থ। ‘ দাদা, কী করছ? কী ভয়ঙ্কর আঁধি; আমার তো মনে হয়, ভূকম্প্-ও হচ্ছে।‘ তো আমি একটু হাসলাম, ‘আরে না না; ভূমিকম্প হলে বিল্ডিঙের এক দিকেই শুধু হবে না!’ আসলে তার দু তিন দিন আগেই দিল্লি অঞ্চলে ভাল মতো ভূমিকম্প হয়ে গেছে। আফগানিস্তানের জোরদার ভুমিকম্পের আফটার-এফেক্ট। আরও বড় কথাটা আর বললাম না। ‘অতো ভয় পাচ্ছ কেন? বাস্তু-সম্মত অ্যাপারটমেন্ট, ভূকম্পেও কিস্যু হবে না’। অবশ্য এটা তো আর বলা যায় ন!
তবে সবচেয়ে মজার কেলেঙ্কারিটা তার কিছু দিন পর।
যে বিজনেস স্কুলে তখন আমি পড়াই, সেখানে।
নতুন ডাইরেক্টর এসেছেন। ঘটনা চক্রে তিনিও বাঙালি। এবং কলকাতাতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাঙলা ছেড়েছেন বেশ পরিণত বয়সে। বেশ রুচিশীল। মার্জিত ভদ্রলোক। অধ্যাপনা ছাড়াও অন্য কিছু দায়িত্ব সামলাতাম। ফলে, আমার সঙ্গে ইন্টার্যাকশন বেশি হতো। ধীরে ধীরে একটা আন্তরিক সম্পর্কও গড়ে উঠলো। একেবারেই অসাম্প্রদায়িক মানুষ। সকলের সাথেই খুব ভাল সম্পর্ক হয়ে গেলো। ঐ প্রতিষ্ঠানে পূর্বাপর ডাইরেক্টর-ভীতি অনেকটাই কেটে গেলো। সোজা কথায়, এই রকম ডাইরেক্টর পেয়ে পুরো পরিবেশটাই বদলে গেলো। তবে, এতো ভাল তো অনেকেরই ঠিক বরদাস্ত হোল না। হয়ও না। সব প্রতিষ্ঠানেই এরকম মহাপুরুষ মজুদ আছেন। ভারতে সংখাটা কিঞ্চিৎ বেশিই হবে। ফলে একটা আন্ডারকারেন্ট ফীল করতে শুরু করলাম। প্রমথ নাথ বিশী মহাশয় তো লিখেই গেছেন বাঙালির জাতীয় স্লোগান; ‘আয় ভাই, টেনে নামাই’। তবে এই উপমহাদেশের সকল কোণেই এ’কথা বলা যায়! মিঃ বোসও সেটা বুঝতে পারছিলেন। তবে অভিজ্ঞ মানুষ। আমরাও ভাবলাম ঠিকই সামলে নেবেন।
কদিন বাদে দেখলাম ডাইরেক্টরের অফিসটায় ভাঙ্গাচুর শুরু হয়েছে। তোড়ফোড়। এবং ডাইরেক্টর অন্য একটা সাধারণ অকুলীন ঘরের থেকে কাজ চালাচ্ছেন। ওঁর ব্যক্তিগত সচিবদের একজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, বোস মশাই ওঁর অফিসের বাস্তু-দোষ মেরামত করছেন। হপ্তা দুয়েক লাগবে। আমি স্বভাবতই একটু অবাক হলাম! হায় শেষে ওনারও দুর্মতি! আসলে এইসব ব্যাপারে আমি চিরদিনই একটু অসহিষ্ণু। তবে এটা বুঝলাম, উনি ভয় পেয়েছেন। এবং নিজের অপর আস্থা হারিয়েছেন।
এর ঠিক এক সপ্তাহ বাদেই একটা জরুরি মিটিঙের নোটিস পেলাম। ডাইরেক্টর ডেকেছেন। জেনারেল হলে। সব অধ্যাপক ও অ্যাডমিন-এর সব অফিসারকে এত্তেলা পাঠানো হয়েছে। সেদিনই বিকেল সাড়ে চারটেয়। গেলাম। মিঃবোস এলেন। একটু একথা সেকথার পর শুরু করলেন, আপনাদের সকলকেই অনেক ধন্যবাদ। আমি রিজাইন করেছি। প্রেসিডেন্টকে আমার চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছি। জাস্ট এটুকুই। আমরা যথারীতি হতবাক ও হতাশ! তাহলে কি সত্যিই বাস্তু-দোষ বলে কিছু আছে! ভালই তো চালাচ্ছিলেন। ওঁর আগে যারা ঐ পদে ছিলেন, তাঁরা তো দিব্যি কাজ করে গেছেন। মাঝে পড়ে এক মাত্র এই ভদ্রলোক বাস্তুর চক্করে উদ্বাস্তু হয়ে গেলেন!
আমরা একজন সত্যিকারের ভাল ডাইরেক্টর হারালাম। অফিস পলিটিক্স সামলানোর ক্ষমতা যে বাস্তু শাস্ত্রের ততটা নেই বুঝতে পারছিলাম! অবশ্য এ’কথাই বা বলি কী করে? ওনার অফিস-ডায়নামিক্স হ্যান্ডল করার অক্ষমতাকে দোষ দেওয়াটাই হয়তো সঠিক পর্যবেক্ষণ হবে। বাস্তুকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল, আশির দশকে একটি বাঙলা ছবি রিলিজ করেছিল। নাম ছিল ‘ডুব দে মন কালী বলে’। আমার এক সিনেমাপাগল বন্ধুর মন্তব্যটা মনে পড়ে গেলো। ‘ছবিটা তো এমনিই ডুববে! আবার কালীর নাম নেওয়া কেন?’ যতদূর জানি, ঐ প্রতিষ্ঠানে ওঁর পরে গত বিশ বছরে সব ডাইরেক্টরই ঐ বাস্তুদোষাক্রান্ত অফিসে বসেই সুন্দরভাবেই কাজ করে চলেছেন।
যাপন-নামা (পর্ব ৩)
মণিপদ্ম দত্ত
মণিপদ্ম দত্ত




মন্তব্য