.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0$sn=0$show=post

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৪) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল

সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ১) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
পুস্তক ১ • অধ্যায় ২ • পর্ব ১

লাল ওষুধ

MERCUROCHROME

পদ্মা—আমাদের নাদুসনুদুস পদ্মা—কী রাজকীয় মেজাজেই না গাল ফুলিয়ে বসে আছে। (সে লেখাপড়া জানে না, আর সকল মৎসপিয়াসী লোকেদের মতোই, নিজে যা জানে না অন্য কেউ তা জানুক, এটা তার একেবারেই না-পসন্দ। পদ্মা: শক্তপোক্ত, হাসিখুশি, আমার এই শেষ দিনগুলোর এক পরম ভরসা। ওর স্বভাবটা খানিক অন্যরকম—নিজে যা পারে না, অন্য কাউকে সেটা করতে দেখলে ওর মেজাজ বিগড়ে যায়।) আমাকে আমার লেখার টেবিল থেকে টেনে তোলার জন্য ওর কতোই না সাধ্যসাধনা: ‘খেয়ে নাও না, খাবারটা যে নষ্ট হয়ে গেল।’ কিন্তু আমি, একগুঁয়ের মতো কাগজের ওপর ঝুঁকেই বসে রইলাম। ‘কী এমন মহামূল্যবান কাজটা হচ্ছে শুনি…,’ পদ্মা খেঁকিয়ে উঠল, বিরক্তিভরে তার ডান হাতটা শূন্যে ওপর-নিচ করে কাটার মতো নাড়াতে নাড়াতে বলল, ‘…যে সব বাদ দিয়ে এভাবে ছাইপাশ লেখালেখি না করলেই নয়?’ আমি জবাব দিলাম: এখন; যখন আমার জন্মের সব খুঁটিনাটি আমি ফাঁস করেই দিয়েছি, এখন; যখন ডাক্তার আর রোগীর ঠিক মাঝখানটায় ওই ফুটোওয়ালা চাদরটা এসেই পড়েছে, তখন আর আমার পিছন ফেরার কোনো রাস্তা নেই। পদ্মা তাচ্ছিল্যভরে নাক দিয়ে একটা শব্দ করল। কবজি দিয়ে নিজের কপালে সজোরে চাপড় মেরে বলল: ‘ঠিক আছে, না খেয়ে মরতে হয় তো মরো, কার দু-পয়সার ঠেকা পড়েছে?’ আরও জোরে, চূড়ান্তরকম একটা নাক-ঝাড়ার শব্দ... কিন্তু ওর এই হাবভাবে আমি বিন্দুমাত্র আপত্তি করলাম না। পেট চালানোর দায়ে সারাদিন ধরে তো ওকে টগবগ করে ফুটতে থাকা ডেকচি নাড়তে হয়; আজ রাতে হয়তো গরম আর ভিনিগারের মতো ঝাঁঝালো কোনো কিছুই ওর মেজাজটা এমন সপ্তমে চড়িয়ে দিয়েছে। চওড়া কোমর আর হাতের ওপরটায় হালকা রোমওয়ালা মেয়েটা গটগট করে পা ফেলে, হাত-পা নাড়তে নাড়তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বেচারি পদ্মা। কথায় কথায় ওর মেজাজ বিগড়ে যায়। এমনকী হয়তো ওর নামটার জন্যেও: অবশ্য সেটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়, কারণ ও যখন খুব ছোটো, তখন ওর মা ওকে বলেছিল যে খোদ পদ্ম-দেবীর নামেই ওর নাম রাখা হয়েছে, অথচ গাঁ-গঞ্জের লোকজনের কাছে ওই দেবীর সবচেয়ে চলতি ডাকনামটা হলো, ‘গোবরেশ্বরী’।
   নতুন করে নেমে-আসা এই নীরবতার মধ্যে, আমি আবার ফিরে এলাম আমার ওই হালকা হলুদের গন্ধ-মাখা কাগজের পাতাগুলোর কাছে। গতকাল যে-গল্পটাকে আমি একেবারে মাঝপথে ত্রিশঙ্কুর মতো ঝুলিয়ে রেখেছিলাম, আজ সানন্দে তার যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে আমি পুরোপুরি প্রস্তুত—ঠিক যেমনটা শেহেরজাদ রাতের পর রাত ধরে করত, স্রেফ নিজের প্রাণটা বাঁচানোর দায়ে—রাজকুমার শাহরিয়ারকে কৌতূহলের আগুনে পুড়িয়ে মারার জন্য! আমি আর কালবিলম্ব না করে এক্ষুনি শুরু করছি: আর শুরুতেই এই কথাটা ফাঁস করে দিই যে, ওই দালানে দাঁড়িয়ে দাদুর মনে যে কুডাক ডেকেছিল, তা কিন্তু একেবারেই অমূলক ছিল না। পরবর্তী মাস আর বছরগুলোতে, তিনি এমন এক মোহজালে আটকা পড়লেন যাকে কেবল জাদুকরের ভোজবাজি বলেই ব্যাখ্যা করা যায়; আর সেই জাদুটা ছিল ওই পেল্লায়—এবং তখনও পর্যন্ত একেবারে দাগহীন—ফুটোওয়ালা চাদরটার।
   ‘আবার?’ চোখ উলটে আদমের মা বলে উঠলেন। ‘তোকে বলে রাখছি বাছা, কিচ্ছু হয়নি ওর। কেবল মাত্রাছাড়া আরাম-আয়েশে গা ভাসিয়ে দেওয়ার জন্যই মেয়েটার আজ এমন রুগ্ন দশা। আহ্লাদীপনার অসুখ। মাথার ওপর মায়ের কড়া হাতের শাসন তো নেই, তাই দিনরাত গাদাগুচ্ছের মিষ্টি খাওয়া আর আস্কারা পেয়ে পেয়ে একেবারে বিগড়ে যাওয়া। তা তুই যা, গিয়ে তোর ওই অদৃশ্য রোগিরই সেবাযত্ন করগে যা, তোর মায়ের এই সামান্য মাথাধরা…সে ঠিক নিজেই সামলে নিতে পারবে।’
   সেই বছরগুলোতে…বুঝলেন কি না, জমিদার-কন্যা নাসিম ঘানি একগাদা আজব সব ছোটোখাটো ব্যামোয় নিয়মিত ভুগতে শুরু করল। আর প্রতিবারই উপত্যকায় ততদিনে বেশ নামডাক কামিয়ে-ফেলা পেল্লায় নাকওয়ালা সেই লম্বা তরুণ ডাক্তার সাহেবকে ডেকে আনার জন্য একজন শিকারাওয়ালাকে পাঠানো হতো। সেই যে ঘরটায় একফালি রোদ এসে পড়ত আর তিন পালোয়ান মহিলা বসে থাকত, সেখানে ডাক্তার আদম আজিজের ডাক পড়াটা যেন একটা সাপ্তাহিক রুটিন হয়ে দাঁড়াল; আর প্রতিবারই ওই কাটা চাদরের মধ্যে দিয়ে ওই যুবতীর শরীরের আলাদা আলাদা সাত ইঞ্চির এক-একটা গোল অংশের এক ঝলক দেখার সুযোগ তাঁর জুটত। তার প্রথম দিককার সেই পেটব্যথা সারতে না সারতেই ডান পায়ের গোড়ালিতে একটু মোচড় লাগল, তারপর বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলে নখকুনি দেখা দিল, কিছুদিন পর বাঁ পায়ের ডিমের নিচের দিকে একটা ছোট্ট কাটা ছেঁড়া। (‘টিটেনাস কিন্তু বড্ড সাঙ্ঘাতিক রোগ ডাক্তার সাহেব,’ জমিদার বলতেন, ‘একটু আঁচড় লেগেছে বলে আমার নাসিম তো আর তাতে অঘোরে প্রাণটা খোয়াতে পারে না।’) এরপর এল তার ডান হাঁটুর আড়ষ্ট হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা, ডাক্তারকে অগত্যা সেই চাদরের ফুটোর মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে সেটা মালিশ করে ঠিক করতে হলো... আরো কিছুদিন পর পর অসুখগুলো কিছু অকথ্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সযত্নে এড়িয়ে একেবারে ওপরের দিকে লাফ মারল, আর সেগুলো তার শরীরের ওপরের অংশেই বেশি করে ডালপালা মেলতে শুরু করল। সে এক অদ্ভুত রহস্যজনক অসুখে পড়ল, তার বাবা যার নাম দিল আঙুল-পচা রোগ, যে অসুখে তার হাতের চামড়া উঠতে শুরু করল; তারপর কবজির হাড়ের দুর্বলতা—যার জন্য আদম তাকে ক্যালসিয়ামের বড়ি দিল; আর তারপর কোষ্ঠকাঠিন্যের ধাত, যার জন্য তাকে পেট-পরিষ্কারের ওষুধ দিতে হলো, কারণ এনিমা দেওয়ার জন্য অনুমতি পাওয়ার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। থাকতে থাকতে তার যেমন জ্বর হতো, তেমনি মাঝে মাঝে গায়ের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যেত। সেইসব সময়ে তার বগলের তলায় থার্মোমিটার গুঁজে দেওয়া হতো, আর ডাক্তার এই পদ্ধতির অপূর্ণতা নিয়ে আপনমনেই উসখুস করে আপত্তি জানাতেন। অন্য বগলটায় একবার তার হালকা টিনিয়াক্লোরিস হলো, আর তিনি তাতে হলুদ পাউডার ছড়িয়ে দিলেন; এই চিকিৎসার জন্য তাঁকে খুব আলতো অথচ শক্ত হাতে পাউডারটা ঘষে ঘষে লাগিয়ে দিতে হয়েছিল, আর তাতে সেই নরম গোপন শরীরটা থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছিল। চাদরের ওপাশ থেকে তিনি এক চাপা হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন, কারণ নাসিম ঘানির সুড়সুড়ি ছিল বড্ড বেশি—যাই হোক, এরপর সেই চুলকানি তো কমল, কিন্তু খুব শিগগিরই নাসিম নতুন রোগের ফিরিস্তি হাজির করল। গ্রীষ্মকালে তার রক্তাল্পতা দেখা দিত আর শীতকালে ধরত ব্রঙ্কাইটিসের ধাত। (‘ওর শ্বাসনালিগুলো বড্ড নাজুক,’ ঘানি ব্যাখ্যা করত, ‘একেবারে ছোটো ছোটো বাঁশির মতো।’) বহু দূরে মহাযুদ্ধ যখন এক সংকট থেকে আরেক সংকটের দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন এই মাকড়সার জাল-মাখা বাড়িটাতে বসে ডাক্তার আজিজও যেন তাঁর সেই খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত রোগীর শেষ-না-হওয়া অসুখবিসুখের বিরুদ্ধে এক পুরোদস্তুর যুদ্ধে মেতে উঠেছেন। আর, যুদ্ধের ওই এতগুলো বছর ধরে, নাসিমের কোনো অসুখই কখনো দু-বার ফিরে আসেনি। ‘যা থেকে কেবল এটাই প্রমাণ হয়,’ ঘানি তাঁকে বললেন, ‘যে আপনি সত্যিই একজন উঁচুদরের ডাক্তার। আপনি যা সারান, তা এক্কেবারে পাকাপাকিভাবেই সেরে যায়। কিন্তু হায় রে কপাল!’—সে নিজের কপালেই চাঁটি মারল— ‘বেচারি মেয়েটা… ওর মরা মায়ের জন্য বড্ড মনকেমন করে, আর তাতেই ওর শরীরের এমন হাল হয়। বড্ড আদুরে মেয়ে কি না।’
   এইভাবে দেখতে দেখতে ডাক্তার আজিজের মনের ভেতর নাসিমের একটা আস্ত ছবি দানা বেঁধে উঠল। তবে সে এক অদ্ভুত ছবি। ওই যে আলাদা আলাদা করে দেখা তার শরীরের সব টুকরো টাকরা অংশ, তাই জোড়াতালি দিয়ে গড়া এক বেখাপ্পা কোলাজ। এই খণ্ড-বিখণ্ড মেয়েমানুষটির অলীক ছায়ামূর্তিটা তাঁকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে তাড়া করে বেড়াতে লাগল। শুধু ঘুমের মধ্যেই নয়, জাগরণেও। তাঁর কল্পনার আঠায় সেঁটে গিয়ে সেই মূর্তি এখন রুগি দেখতে যাওয়ার পথে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে; সে এসে জাঁকিয়ে বসেছে তাঁর মনের একেবারে সামনের বারান্দাটায়। ফলে কী জেগে, কী ঘুমিয়ে, তিনি সর্বক্ষণ তাঁর আঙুলের ডগায় টের পেতে লাগলেন সেই সুড়সুড়িওলা নরম চামড়ার ছোঁয়া, কিংবা সেই নিখুঁত ছোট্ট কব্জি দুটো, বা সেই অপরূপ গোড়ালির গড়ন। নাকে এসে লাগত ল্যাভেন্ডার আর চামেলি ফুলের মিশ্র সুগন্ধ; কানে ভেসে আসত তার গলার স্বর আর সেই ছোট্ট খুকিটার মতো অদম্য খিলখিল হাসির শব্দ। কিন্তু মুশকিল হলো, সেই মূর্তিটা ছিল মাথাকাটা। মুণ্ডহীন। কারণ, মেয়েটির মুখখানাই যে তিনি কোনোদিন দেখেননি।
   তাঁর মা বিছানায় উপুড় হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে ছিলেন। ‘আয়, আয়… একটু টিপে দে দিকি,’ তিনি বললেন, ‘আমার এই ডাক্তার ছেলের আঙুলগুলো ওর বুড়ি মায়ের পেশির ব্যথা কেমন জুড়িয়ে দিতে পারে…। টিপে দে, টিপে দে বাছা আমার…, ওই দ্যাকো… মুখখানা আবার করে রেখেছে একেবারে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা রাজহাঁসের মতো।’ সন্তান আজিজ তাঁর কাঁধদুটো একটু করে ডলে দিতে লাগল। তিনি একটা আরামের গোঙানি দিলেন, একটু নড়েচড়ে উঠলেন, তারপর শরীরটাকে একেবারে এলিয়ে দিলেন। ‘এবার একটু নীচে,’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ এবার ওপরে। ডানদিকে। খাসা। আমার এই গুণধর ছেলেটা টেরই পাচ্ছে না যে ওই জমিদার ঘানি আসলে কী ফন্দি আঁটছে। ছেলে আমার এমনিতে চালাকচতুর, অথচ সে এইটুকু আন্দাজ করতে পারছে না যে কেন ওই মেয়েটা সবসময়ে তার ওইসব ছিঁচকে ব্যামো নিয়ে ভুগে চলেছে। আরে বোকা, সাদা চোখে যা দেখা যাচ্ছে তাই ধরতে পারছিস না? শোন শোন; একবার অন্তত নিজের মুখের ওই নাকটার দিকে তাকিয়ে দেখ। ওই ঘানি ব্যাটা তোকে তার মেয়ের জন্য খাসা পাত্র ঠাউরেছে। একেবারে বিলেত-ফেরত শিক্ষিত ছেলে কিনা। আমি দোকানে বসে খেটেছি আর অচেনা পুরুষদের চোখের দৃষ্টি আমাকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছে, সে কি শেষে তোর ওই নাসিমকে বিয়ে করার জন্য! আমি বিলক্ষণ জানি যে আমি ঠিক বলছি; তা না হলে আমাদের মতো একটা পরিবারের দিকে সে দু-বার ফিরে তাকাবেই-বা কেন?’ আজিজ মায়ের গায়ে একটু জোরেই চাপ দিলেন। ‘ওরে বাবা রে, থাম এবার, সত্যি কথাটা বলেছি বলে আমাকে একেবারে টিপে মেরে ফেলবি নাকি!’
   ১৯১৮ সাল আসতে আসতে, আদম আজিজের ওই লেক পেরিয়ে যাওয়ার নিয়মিত চক্কর-টার ওপর কেমন একটা টান জন্মে গেছিল। আর এখন তাঁর সেই উৎসাহটা যেন আরও জাঁকিয়ে বসল। কারণ এটা বেশ খোলসা হয়ে গেল যে, এই তিন বছর বাদে, জমিদার আর তাঁর মেয়ে এখন যেন খানিকটা নরম হয়েছে, কিছু কিছু বাধা-নিষেধ তুলে নিতে রাজি হয়েছে। এই প্রথমবার, ঘানি সাহেব বললেন, ‘ডান দিকের বুকটায় একটা ডেলা মতো…। ভয়ের কিছু নাকি ডাক্তার? দেখুন তো। ভালো করে দেখুন।’ আর অমনি, সেই ফুটোটার ফ্রেমে, ফুটে উঠল একখানা নিখুঁত, একেবারে যাকে বলে কাব্যি করার মতো সুন্দর… ‘ওটা আমায় ছুঁয়ে দেখতে হবে,’ আজিজ গলাটা সামলে নিয়ে বললেন। ঘানি সাহেব তাঁর পিঠে একখানা চাপড় কষালেন। ‘ছুঁয়ে দেখুন না, দেখুন!’ সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘এ যে ডাক্তারের হাত! রোগ সারানোর হাত, কী বলেন ডাক্তার?’ আর আজিজ হাতখানা বাড়ালেন… ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করছি, কিছু মনে করবেন না; ‘ওর কি... মানে... মাসের ওই সময়টা?’... ওই পালোয়ান গোছের মেয়েমানুষগুলোর মুখে এক চিলতে গোপন হাসি খেলে গেল। ঘানি সাহেব অমায়িক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন: ‘হ্যাঁ। আরে, এত লজ্জা কিসের, এত ঘাবড়ানোরও কিছু নেই হে। আমরা তো এখন ডাক্তার-ফ্যামিলি।’ আর আজিজ, ‘তাহলে চিন্তার কিছু নেই। সময়টা পেরোলেই ওই ডেলাও মিলিয়ে যাবে।’ … আর তার পরের বার, ‘উরুর পেছন দিকে একটা পেশিতে যা টান ধরেছে ডাক্তার সাহেব। সে কী ব্যথা!’ আর অমনি, চাদরের সেই ফুটোটায়, আদম আজিজের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে, ঝুলে রইল একখানা জব্বর গোলগাল, একেবারে অবিশ্বাস্য... পাছা। এবার আজিজ: ‘আচ্ছা, এটা কি... মানে... অনুমতি আছে…’ যেই না বলা, ঘানি সাহেবের মুখ থেকে একখানা হুকুম গেল; চাদরের ওপার থেকে একখানা বাধ্য মেয়ের মতো জবাব এল; একটা দড়িতে টান পড়ল; আর সেই স্বর্গীয় পাছাখানা থেকে পাজামা খসে পড়ল, আর সেটা সেই ফুটোর মধ্যে দিয়ে আরও জাঁকিয়ে পরিস্ফূট হয়ে উঠল। আদম আজিজ অনেক কষ্টে নিজের মনটাকে ফের ডাক্তারি-চালে বাঁধলেন... হাত বাড়ালেন... ছুঁলেন। আর, তাজ্জব বনে গিয়ে, মনে মনে কসম খেয়ে বললেন যে, তিনি যেন স্পষ্ট দেখলেন, একটা লাজুক অথচ বাধ্য লজ্জার আভায় ওই নিতম্বটা কেমন লাল হয়ে উঠছে।
দীপা মেহতা পরিচালিত 'মিডনাইটস চিলড্রেন' (২০১২) সিনেমায় আদম আজিজ চরিত্রে অভিনেতা রজত কাপুর।
দীপা মেহতা পরিচালিত ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ (২০১২) সিনেমায় আদম আজিজ চরিত্রে অভিনেতা রজত কাপুর।

   সেই সন্ধ্যায় আদম ওই লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠার ব্যাপারটা নিয়েই আনমনা হয়ে রইলেন। ওই চাদরের জাদুটা কি ফুটোটার দু-পাশেই সমানভাবে কাজ করে? ভারী উত্তেজনার বশে সে কল্পনা করতে লাগল, তাঁর ওই মাথাকাটা নাসিমও কি তাঁর চোখের, তাঁর থার্মোমিটারের, তাঁর স্টেথোস্কোপের, তাঁর আঙুলের ছোঁয়ায় ঠিক তার মতোই অমন শিরশির করে উঠছিল? আর সে-ও কি মনে মনে তাঁর একটা ছবি আঁকার চেষ্টা করছিল? সে বেচারি অবশ্য এ-দিক থেকে বেশ অসুবিধাতেই ছিল, কারণ ডাক্তারের হাতদুটো ছাড়া তো আর কিছুই সে দেখেনি... এক নিষিদ্ধ আর মরিয়া আকুলতা নিয়ে আদম মনে মনে প্রার্থনা করতে শুরু করল, নাসিম ঘানির যেন একটা মাইগ্রেন বা ওরকম কিছু হয়, বা তার ওই না-দেখা চিবুকটায় অন্তত একটু ছড়ে যায়, যাতে তারা অন্তত একবার একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে পারে। সে বিলক্ষণ জানত যে তার এই অনুভূতিগুলো একজন ডাক্তারের পক্ষে একেবারেই বেমানান; কিন্তু তবু সেগুলোকে গলা টিপে মারার কোনো চেষ্টাই সে করল না। করার মতো তার হাতে আর বিশেষ কিছু ছিলও না। এই অনুভূতিগুলো যেন ততদিনে নিজেদের মতো করে একটা আলাদা প্রাণ পেয়ে গেছে। এককথায় বলতে গেলে: আমার দাদু ততদিনে রীতিমতো প্রেমে পড়ে গেছেন, আর ওই ফুটোওয়ালা চাদরটাকে তিনি এক পবিত্র আর জাদুকরী জিনিস বলে ভাবতে শুরু করেছেন, কারণ ওরই মধ্যে দিয়ে তিনি এমন কিছু জিনিসের দেখা পেয়েছিলেন, যা তাঁর বুকের ভেতরের সেই গর্তটাকে পুরোপুরি ভরিয়ে দিয়েছিল—যে-গর্তটা কিনা তৈরি হয়েছিল সেই যেদিন ঘাসের চাপড়ার ঘায়ে তাঁর নাকে চোট লেগেছিল আর মাঝি তাই তাঁকে চরম অপমান করেছিল।
   যেদিন বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো, ঠিক সেই দিনটিতেই নাসিমের সেই বহু কাঙ্ক্ষিত মাথাধরাটা দেখা দিল। এমন সব ঐতিহাসিক কাকতালীয় ঘটনা পৃথিবীর বুকে আমাদের পরিবারের অস্তিত্বটাকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে ছেয়ে রেখেছে, আর হয়তো-বা বেশ খানিকটা ঘেঁটেও দিয়েছে।
   চাদরের ওই ফুটোটার ফ্রেমে কী যে আছে, সেদিকে তাকাতে তাঁর যেন সাহসেই কুলোচ্ছিল না। কে জানে, হয়তো মেয়েটা দেখতে বেজায় কুৎসিত; আর হয়তো ঠিক সেই কারণেই এতসব ভণিতা...। শেষমেশ তিনি তাকালেন। আর দেখলেন একখানা স্নিগ্ধ মুখ, যা কিনা মোটেই কুৎসিত নয়, বরং ভারী মিষ্টি; সে মুখখানা যেন তার সেই জহরতের মতো ঝকঝকে চোখ দুটোর জন্য একখানা নরম গদি। চোখ দুটো বাদামি, তাতে আবার সোনার ছিটে: ঠিক যেন বাঘের চোখ। ডাক্তার আজিজ একেবারে কুপোকাত। আর নাসিমও ফট্‌ করে বলে উঠল, ‘কিন্তু ডাক্তার সাহেব, বাস রে!, কী নাক আপনার!’ ঘানি রেগেমেগে বলে উঠল, ‘নাসিম, মুখ সামলে…’ কিন্তু ততক্ষণে রোগী আর ডাক্তার দুজনেই একসঙ্গে হাসিতে ফেটে পড়েছেন, আর আজিজ বলছিলেন, ‘তা যা বলেছ, এ একখানা দেখার মতো জিনিস বটে। লোকে তো বলে এর ভেতরে নাকি আস্ত এক-একটা রাজবংশ ঘাপটি মেরে বসে আছে…’ আর কথাটা বলেই তিনি জিভ কাটলেন, কারণ ঠিক এরপরই তিনি বলতে যাচ্ছিলেন, ‘...ঠিক নাকের সর্দির মতো।’ 
   আর ঘানি, যে কি না দীর্ঘ তিনটে বছর ধরে ওই চাদরের পাশে অন্ধের মতো দাঁড়িয়ে কেবল হেসেই গেছে, হেসেই গেছে আর হেসেই গেছে, সে আবারও তার সেই গোপন হাসিটা হাসতে শুরু করল, আর সেই হাসিরই অবিকল ছায়া গিয়ে পড়ল ওই পালোয়ানদের ঠোঁটে।

পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]

মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
অনুবাদ: দীপ মন্ডল



মন্তব্য

BLOGGER: 4
  1. হাসানুর জামান পাড়১ আগস্ট, ২০২৬ এ ৯:২৮ PM

    উফ! সত্যিই দারুণ লাগছে পড়তে। উপন্যাসটার এত নাম শুনেছি, এই প্রথম পড়ছি। খুব ভালো অনুবাদ। মনেই হচ্ছে না অনুবাদ পড়ছি। ধন্যবাদ!

    উত্তরমুছুন
  2. উপন্যাসটা আমি ইংরেজিতে পড়েছি। রুশদির লম্বা লম্বা বাক্য ব্যাবহার করেন। সেই ইংরেজি গদ্যকে বাংলায় অনুবাদ করা সত্যিই কঠিন। এখানে আমি দেখলাম অনুবাদক নিপুণ হাতে সেইসব বাক্যকে অনুবাদ করেছেন।

    উত্তরমুছুন
  3. একটা ভালো অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি পাঠকের আস্থা তৈরি করে। খুব ভালো হয়েছে অনুবাদ। অনুবাদ পড়ে বোঝা যাচ্ছে যে অনুবাদক মূল লেখার খুব কাছাকাছি থাকতে পেরেছেন।

    উত্তরমুছুন
মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ করুন।

অনুবাদ আত্মজীবনী আর্ট-গ্যালারী আলোকচিত্র ই-বুক ইচক দুয়েন্দে ইশতেহার উৎপলকুমার বসু উপন্যাস ঋত্বিক-ঘটক কবিতা কবিতায় কুড়িগ্রাম কর্মকাণ্ড কার্ল মার্ক্স গল্প গিন্সবার্গ চার্লস বুকাওস্কি ছড়া জার্নাল জীবনী দশকথা দিনলিপি পাণ্ডুলিপি পুনঃপ্রকাশ পোয়েটিক ফিকশন প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা প্রবন্ধ প্রিন্ট সংখ্যা বই বর্ষা সংখ্যা বসন্ত বিক্রয়বিভাগ বিবিধ বিবৃতি বিশেষ বুলেটিন বৈশাখ ভাষা-সিরিজ ভিডিও মাসুমুল আলম মুক্তগদ্য মে দিবস যুগপূর্তি রিভিউ লকডাউন শম্ভু রক্ষিত শাহেদ শাফায়েত শিশুতোষ সন্দীপ দত্ত সম্পাদকীয় সাক্ষাৎকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ সৈয়দ সাখাওয়াৎ স্মৃতিকথা হেমন্ত
নাম

অনুবাদ,63,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,ইশতেহার,2,উৎপলকুমার বসু,26,উপন্যাস,5,ঋত্বিক-ঘটক,5,কবিতা,348,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,17,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,85,গিন্সবার্গ,2,চার্লস বুকাওস্কি,40,ছড়া,1,জার্নাল,6,জীবনী,7,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,24,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,193,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,3,বিবৃতি,1,বিশেষ,26,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,45,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,20,সাক্ষাৎকার,26,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৪) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন (পর্ব ৪) • বাংলা অনুবাদ: দীপ মন্ডল
মধ্যরাতের সন্তানেরা • সালমান রুশদির বুকারজয়ী উপন্যাস মিডনাইটস চিলড্রেন-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন দীপ মন্ডল৷
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s1600/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgeRgp7MV3MVjqdWQPggKmrClfDaNWkTe904uIJl0sgQrdxlrfbiRislYW-ZvIBYZwiH1DRyUuKu7h9sjp1t6n5ZK7LCabxeNkcRaAu3lEsXyiE3ArUMz-1EWiStFZ4cm_O5bNsMWBk9mwLwPtNZ6aW8c0AgehsYz0lXOZ-0CG68AgShSTQkWU-wGvxrHs/s72-c/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%B8%20%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%20%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/08/midnights-children-4.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/08/midnights-children-4.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy