এদিকে, সেই মাঝি, তাইয়ের মাথায় কোত্থেকে কে জানে একখানা অদ্ভুত খেয়াল চাপল—সে চান-টান করা সব ছেড়ে দিল। মিষ্টি জলের হ্রদে পরিপূর্ণ এমন একটা উপত্যকায়, যেখানে একেবারে হতদরিদ্র মানুষটাও নিজের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বড়াই করতে পারত (এবং করতও), সেখানে তাই কিনা বেছে নিল গায়ের দুর্গন্ধকে। এই নিয়ে তিন বছর হতে চলল, সে একবারের তরেও স্নান করেনি, এমনকী শৌচকর্মের পর নিজেকে পানি দিয়ে পরিষ্কার পর্যন্ত করেনি। বছরের পর বছর ধরে সে ওই একই ময়লা জামাকাপড় পরে কাটিয়ে দিচ্ছে; শীতের হাত থেকে বাঁচতে সে কেবল তার বোঁটকা-গন্ধ বেরোনো পাজামার ওপর একটা চোগা-চাপকান গলিয়ে নিত। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় গা গরম রাখার জন্য কাশ্মীরের রেওয়াজ মেনে সে চোগার ভেতর যে গরম কয়লার ছোট্ট মালসাটা নিয়ে ঘুরত, সেটা কেবল তার গায়ের ওই জঘন্য দুর্গন্ধটাকে যেন আরও উসকে দিত। সে আজিজদের বাড়ির পাশ দিয়ে বড্ড ধীরেসুস্থে নৌকো বেয়ে যেতে শুরু করল, যাতে তার শরীর থেকে বেরোনো সেই জঘন্য ভ্যাপসা গন্ধটা ছোট্ট বাগানটা পেরিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরে গিয়ে সেঁধোয়। ফুলগুলো মরে গেল; আজিজের বুড়ো বাবার স্থির জানালার কার্নিশ ছেড়ে পাখিরা সব পাততাড়ি গোটাল। স্বাভাবিকভাবেই, তাইয়ের কাজকম্মও কমতে শুরু করল; বিশেষ করে সাহেবরা তো জ্যান্ত একটা আঁস্তাকুড়ের সঙ্গে নৌকোয় চাপতে বিলকুল নারাজ। হ্রদের চারপাশের লোকজনের মুখে মুখে একটা গল্প ছড়াল যে, বুড়োর এই হঠাৎ জুটে-যাওয়া নোংরামিতে একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে তার বউ নাকি তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করে বসেছিল। মাঝি নাকি এর জবাবে বলেছিল: ‘কারণটা আমাদের ওই বিলেত-ফেরত ডাক্তারকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর, ওই নাক্কু, ওই জার্মান আজিজকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।’ তবে কি এটা ডাক্তারের ওই বড্ড-বেশি-গন্ধ-পাওয়া নাকের পাটায় (যেখানে বিপদের শিরশিরে সুড়সুড়িটা প্রেমের এক নেশা-ধরানো শুশ্রুষায় ততদিনে বেশ খানিকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে) জোর ধাক্কা দেওয়ারই একটা ফন্দি? নাকি হাইডেলবার্গ থেকে উড়ে-এসে-জুড়ে-বসা ওই অনুপ্রবেশকারী ডাক্তারি ব্যাগের সামনে একগুঁয়ের মতো নিজের অপরিবর্তনশীলতাকে টিকিয়ে রাখার এ একটা ভঙ্গি? একবার আজিজ সটান ওই বুড়োকে জিজ্ঞেস করেই বসলেন, এসবের মানেটা কী; কিন্তু তাই কেবল তাঁর মুখের ওপর একটা শ্বাস ফেলে নৌকো বেয়ে দূরে সরে গেল। সেই শ্বাসের দুর্গন্ধে আজিজ প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার জোগাড়; একেবারে কুড়ুলের কোপের মতোই সাঙ্ঘাতিক ঝাঁঝ ছিল তাতে।
১৯১৮ সালে, সাধের পাখিদের সঙ্গ হারিয়ে ডাক্তার আজিজের বাবা একদিন ঘুমের ঘোরেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন; আর তার পরপরই তাঁর মা—যিনি কিনা আজিজের ডাক্তারি পসার বেশ জমে ওঠার সুবাদে তাঁদের রত্নের ব্যাবসাটা এর মধ্যেই বেচে দিতে পেরেছিলেন, আর স্বামীর এই মৃত্যুকে যিনি দীর্ঘদিনের একরাশ দায়িত্বের ঘানি থেকে এক পরম করুণাময় মুক্তি বলেই মনে করেছিলেন—তিনিও সটান নিজের মৃত্যুশয্যা পেতে ফেললেন। স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিনের শোককালটা পেরোনোর আগেই তিনি ঠিক তাঁর পিছু পিছু পরপারে পাড়ি জমালেন। যুদ্ধের শেষে ভারতীয় সেনাদলগুলো যখন দেশে ফিরতে শুরু করেছে, ততদিনে ডাক্তার আজিজ এক্কেবারে অনাথ, আর একজন স্বাধীন মানুষ—কেবল ওই একটা ব্যাপার ছাড়া; তাঁর হৃদয়খানা ততদিনে প্রায় সাত ইঞ্চি চওড়া একটা ফুটো গলে একেবারে তলিয়ে গেছে।
তাইয়ের ওই আচরণের ফলটা হলো একেবারে মারাত্মক: হ্রদের ওই জলে-ভাসা মানুষজনের সঙ্গে ডাক্তার আজিজের এতদিনের যে একটা দিব্যি সুসম্পর্ক ছিল, সেটা একেবারে ঘেঁটে ঘ হয়ে গেল। ছোটোবেলায় যে মানুষটা মেছুনি আর ফুলওয়ালিদের সঙ্গে একেবারে দিলখোলাঘর আড্ডা দিয়ে বেড়িয়েছেন, সেই তিনি দেখলেন যে এখন সবাই যেন তাঁকে একটু বাঁকা চোখে দেখছে। ‘জিজ্ঞেস কর তোদের ওই নাক্কুকে, ওই জার্মান আজিজকে।’ তাই যেন তাঁর গায়ে এক্কেবারে ভিনদেশি তকমা সেঁটে দিয়েছিল, আর সেজন্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এমন একজন মানুষ—যাকে আর যা-ই হোক, পুরোপুরি বিশ্বাস করা চলে না। এমনিতে লোকজনের যে ওই মাঝিকে খুব একটা পছন্দ ছিল তা নয়, কিন্তু ডাক্তার ছোকরা এসে লোকটার ওপর স্পষ্টতই কী এমন ভেলকি ঘটিয়ে দিল যে সে একেবারে পালটে গেল—এ ব্যাপারটা তাদের কাছে আরও বেশি গোলমেলে ঠেকল। আজিজ বেশ বুঝতে পারলেন যে গরিবগুরবো মানুষগুলো তাঁকে রীতিমতো সন্দেহের চোখে দেখছে, এমনকী বলা যায় প্রায় একঘরেই করে রেখেছে; আর এই ব্যাপারটা তাঁকে বেজায় কষ্ট দিল। এবার তিনি তাইয়ের মতলবটা বিলক্ষণ বুঝতে পারলেন: লোকটা আসলে তাঁকে এই উপত্যকা থেকে একেবারে ঘর-ছাড়া করার ফন্দি আঁটছিল।
অন্যদিকে ওই ফুটোওয়ালা চাদরের গপ্পোটাও পাঁচকান হতে আর বাকি রইল না। ওই পালোয়ান গোছের মহিলাগুলোকে দেখে যতটা মনে হয়, পেটে কথা চেপে রাখার কায়দাটা তাদের যে ততটা ভালো জানা ছিল না, তা বেশ মালুম হলো। আজিজ একটু-আধটু খেয়াল করতে শুরু করলেন যে লোকজন তাঁকে দেখে ফিসফাস করে আঙুল দেখাচ্ছে। আর মহিলারা হাতের তালুর আড়ালে মুখ ঢেকে মুচকি মুচকি হাসছে…
‘আমি ঠিক করেছি তাই-কে জিতিয়ে দেব,’ তিনি বললেন। সেই তিনজন পালোয়ান মহিলা—যাদের দুজন চাদরটা টানটান করে ধরে ছিল আর তৃতীয়জন দরজার কাছে ওঁৎ পেতে দাঁড়িয়ে—কানের ভেতর ঠাসা তুলোর ওপর দিয়েই অনেক কসরত করে তাঁর কথাটা শোনার চেষ্টা করল। (‘আমিই আব্বাকে দিয়ে এসব করিয়েছি,’ নাসিম তাঁকে বলল, ‘এখন থেকে এই সব গল্পবাজ লোকেরা আর আমার নামে তিলকে তাল করে কেচ্ছাকাহিনি রটানোর সুযোগ পাবে না।’) চাদরের সেই ফুটোর ঘেরাটোপে নাসিমের চোখদুটো যেন আগের চেয়েও অনেক বড় হয়ে গেল।
...ঠিক যেমনটা হয়েছিল তাঁর নিজের বেলাতেও—দিন কয়েক আগে যখন তিনি শহরের রাস্তায় হাঁটছিলেন, দেখলেন শীতের শেষ বাসটা এসে পৌঁছল…বাসের গায়ে চকমকে সব হরেক রঙের লেখালেখি—সামনে লাল ছায়া দেওয়া সবুজ রঙে লেখা ‘ইনশাআল্লাহ’; পেছনে নীল ছায়া-ফেলা হলুদ অক্ষরে উচ্চকিতভাবে লেখা ‘শুকুর আলহামদুলিল্লাহ!’, আর গাঢ় খয়েরি রঙে বেশ বেয়াড়া ঢংয়ে লেখা ‘স্যরি-বাই-বাই!’—আর ঠিক তখনই, তখনই তিনি চিনতে পারলেন ইলসা লুবিন-কে; তাঁর মুখের চামড়ায় নতুন সব বলিরেখার এক মায়া-জাল বিছানো থাকা সত্ত্বেও বাস থেকে নামার সময় ইলসা-কে তিনি ঠিক চিনে ফেললেন…
আজকাল জমিদার ঘানি ওঁকে ওই কানে-তুলো-গোঁজা পাহারাদারগুলোর সঙ্গে বেশ একলা থাকতে দেন। বলেন, ‘আরে, একটু কথাবার্তা বলুন; ডাক্তার-রুগির সম্পর্ক তো বাপু, এইসব একেবারে আড়ালে-আবডালেই পোক্ত হয়। আমি বাপু এটা এখন বেশ বুঝতে পারছি, আজিজ সাহেব—আগে যে সব ব্যাপারে নাক গলিয়েছি, তার জন্য কিছু মনেটনে করবেন না।’ আজকাল নাসিমের জিভটাও যেন দিনকে দিন বেশ খুলে যাচ্ছিল। ‘এ আবার কী ধরনের কথা! আপনি কি বলুন তো—একটা মরদ না কি একটা ইঁদুর? শেষে কিনা একটা পচা-গন্ধওলা মাঝির ভয়ে আপনি ভিটে ছেড়ে পালাবেন!’...
‘অস্কার মারা গেছে,’ ইলসা ওকে খবরটা দিল। আজিজের মায়ের তক্তপোশে বসে সে তখন তাজা লেবুর সরবতে চুমুক দিচ্ছিল। ‘ঠিক যেন এক কৌতুক অভিনেতার মতো। ও সৈন্যদলের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিল, ওদের বোঝাতে চেয়েছিল যে ওরা যেন স্রেফ দাবার ঘুঁটি হয়ে না থাকে। বোকাটা সত্যিই ভেবেছিল যে ওর কথা শুনে সৈন্যরা অমনি বন্দুক-টন্দুক ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাঁটা দেবে। আমরা জানলা দিয়ে সব দেখছিলাম আর আমি মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম—ওরা যেন ওকে স্রেফ পায়ে মাড়িয়ে দিয়ে চলে না যায়। রেজিমেন্টটা তখন তালে তাল মিলিয়ে কুচকাওয়াজ করতে শিখে গেছে, তুমি দেখলে আর চিনতেই পারতে না। প্যারেড গ্রাউন্ডের ঠিক উল্টো দিকের রাস্তার মোড়ে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই ও নিজের জুতোর আলগা ফিতের সঙ্গে হোঁচট খেয়ে মাঝরাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ল। একটা মিলিটারি স্টাফ কার এসে ওকে ধাক্কা দিল আর ও শেষ। ওই গাধাটা নিজের জুতোর ফিতে কোনোদিনই ঠিকমতো বাঁধতে পারত না...’ এইখানে ইলসাকে বড় করুণ দেখাল, ওর চোখের পাতায় পানিগুলো যেন হীরের কুচির মতো জমে যাচ্ছিল... ‘ও ছিল ঠিক সেই জাতের মানুষ, যাদের জন্য অ্যানার্কিস্টদের মিছিমিছি দুর্নাম হয়।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে,’ নাসিম একটু নরম হয়ে মেনে নিল, ‘তার মানে একটা বেশ ভালো চাকরি জুটে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা আছে তোমার। আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয় তো বেশ নামডাকওয়ালা জায়গা, আমি কিছু জানি না এমনটা ভেবো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার! ...শুনতে বেশ ভালোই লাগছে। তুমি বরং বলো যে তুমি ওটার জন্যই যাচ্ছ, তাহলে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম দাঁড়ায়।’ ফুটোটার মধ্যে চোখের পাতাগুলো একটু ঝুঁকে পড়ল। ‘স্বাভাবিকভাবেই, আমার তো তোমার জন্য মন কেমন করবেই…’
‘আমি প্রেমে পড়েছি,’ ইলসা লুবিনকে বলল আদম আজিজ। খানিক থেমে, পরে আবার বলল ‘...বুঝলে, আমি কেবল ওকে দেখেছি বলতে শুধু একটা চাদরের ফুটোর মধ্যে দিয়ে। এক এক বারে একটু একটু করে; মাইরি বলছি… ওর নিতম্বটা পর্যন্ত লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে।’
‘এখানকার হাওয়ায় ওরা নির্ঘাত কিছু একটা মেশাচ্ছে,’ ইলসা বলল।
‘নাসিম, আমার চাকরিটা হয়ে গেছে,’ আদম বেশ উত্তেজনার বশেই বলল। ‘আজকেই চিঠি এসেছে। ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে কাজ শুরু। তোমার বাবা বলছেন তিনি নাকি আমার এই বাড়ি আর রত্ন-পাথরের দোকানটার জন্য একটা ভালো খদ্দেরও জোগাড় করে দিতে পারবেন।’
‘ভারী চমৎকার,’ নাসিম ঠোঁট ফোলাল। ‘তাহলে এখন আমাকে ফের নতুন কোনো ডাক্তার খুঁজতে হবে। অথবা কে জানে, হয়তো সেই ডাইনি বুড়িটাকেই আবার ডেকে আনতে হবে, যে কিনা কোনোকিছুর মাথামুণ্ডু বোঝে না।’
‘যেহেতু আমি একজন অনাথ,’ ডাক্তার আজিজ বললেন, ‘তাই পরিবারের লোকজনের বদলে আমাকে নিজেই আসতে হলো। তবে যা-ই হোক, ঘানি সাহেব, এই প্রথমবার আমি কিন্তু কারও কোনো ডাক ছাড়াই নিজে থেকে এসেছি। এটা কোনো ডাক্তারি ভিজিট নয়।’
আদমের পিঠে বেশ জুতসই এক চাপড় কষিয়ে ঘানি বলে উঠল, ‘আরে বাবা! অবশ্যই তুমি ওকে শাদি করবে! আর যৌতুক? সে হবে একেবারে রাজকীয় ব্যাপার! খরচের জন্য কোনও কার্পণ্য করা হবে না! একেবারে এই তল্লাটের এ বছরের সেরা বিয়ে হবে, দেখো নিয়ো! সে আমি বলে দিলাম, হ্যাঁ!’
‘আমি যখন যাব, তোমায় তো আর ফেলে রেখে যেতে পারব না,’ আজিজ নাসিমকে বললেন। ‘ঢের হয়েছে এই তামাশা!’ ঘানি বলে উঠলেন—‘ওই চাদরের ভেলকিবাজির আর কোনো দরকার নেই! ওরে তোরা ওটা নামিয়ে ফেল দিকি, এরা যে এখন একেবারে তাজা প্রেমিক-প্রেমিকা!’
‘অবশেষে,’ আদম আজিজ বললেন, ‘অবশেষে আমি তোমাকে পুরোটা দেখতে পেলাম। কিন্তু এখন আমাকে একবারটি উঠতে হবে। রোগিদের দেখতে যাওয়ার ব্যাপার আছে... তাছাড়া আমার এক পুরোনো বন্ধু এখন আমার ওখানেই আছে, তাকে একবার সুখবরটা দিতে হবে, সে আমাদের দুজনের জন্যই খুব খুশি হবে। জার্মানির এক খুব কাছের বন্ধু সে।’
‘না গো আদম বাবা,’ তাঁর বেয়ারা বলল, ‘সকাল থেকেই তো ইলসা ম্যাডামকে একবারও চোখে পড়ল না। উনি শিকারা চড়বেন বলে ওই বুড়ো তাই-কে ভাড়া করেছেন।’
‘আর কী-ই বা বলব, হুজুর?’ মাঝি তাই একেবারে ভেজা বেড়ালের মতো মিনমিন করে বলল। ‘আপনার মতো এমন মস্তবড়ো মানুষের বাড়িতে যে আমায় ডেকে পাঠিয়েছেন, সে তো আমার ভাগ্যি। তা হুজুর, ওই মেমসাহেব আমায় ভাড়া করেছিলেন মোঘল গার্ডেনস-এ এক চক্কর যাবেন বলে... হ্রদটা একেবারে বরফে জমে যাওয়ার আগেই আর কী। বড্ড চুপচাপ গোছের মেমসাহেব ছিলেন, ডাক্তার সাহেব, সারাটা পথে মুখে একটা টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেননি। তা, আমি বাপু আমার নিজের মনেই যত সব আজেবাজে কথা ভাবছিলাম, বুড়োহাবড়া লোকে যেমনটা ভাবে আর কী... হঠাৎ দেখি, মেমসাহেব তাঁর জায়গায় নেই। সাহেব, আমার বউয়ের মাথার কসম খেয়ে বলছি হুজুর, সিটের পিছন দিক থেকে তো আর সামনের দিকটা খেয়াল করা যায় না। আমি কী করে জানব, বলুন? এই গরিব বুড়ো মাঝিটাকে বিশ্বাস করেন হুজুর... ছেলেবেলায় আমি যে আপনার দোস্ত ছিলাম…’
‘আদম বাবা,’ বুড়ো বেয়ারাটা কথা থামিয়ে বলে উঠল, ‘মাফ করবেন হুজুর, এইমাত্র ওঁর টেবিলের ওপর আমি এই কাগজখানা খুঁজে পেলাম।’
‘আমি জানি ও কোথায়,’ ডাক্তার আজিজ একদৃষ্টে তাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ‘আমার মাথায় ঢোকে না তুমি কী করে যে বারবার আমার জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ো; অথচ ওই জায়গাটা তুমিই আমায় একবার দেখিয়েছিলে। তুমিই বলেছিলে: এক জাতের ফিরিঙ্গি মেম আছে, তারা নাকি এই জলে ডুবে মরতে আসে।’
‘আমি, সাহেব?’ তাইয়ের চোখেমুখে এমন একটা চমকে ওঠার ভঙ্গি। গা থেকে ভুরভুর করে দুর্গন্ধ বেরচ্ছে, নিষ্পাপ চেহারা। ‘আসলে শোকে-তাপে আপনার মাথাটা একেবারে ঘুলিয়ে গেছে! আমি এসব কথা কী করে জানব বলুন তো?’
আর তারপর জলজ আগাছা-লতাপাতায় জড়ানো সেই ফুলে ওঠা মৃতদেহটা যখন একদল নিরাসক্ত মুখের মাঝি পানি থেকে টেনে তুলল, তখন তাই, শিকারার আস্তানায় গিয়ে সেখানকার লোকজনকে যা তা বলতে শুরু করল, আর আমাশায় ভোগা বলদের মতো তার মুখের দুর্গন্ধে লোকজন সব ছিটকে সরে সরে যাচ্ছিল। ‘ও আমাকে দোষ দিচ্ছে, একবার ভেবে দ্যাখো! নিজের ওইসব ছেনাল ফিরিঙ্গি মেমগুলোকে এখানে ধরে আনবে, আর তারপর তারা যখন লেকের জলে ঝাঁপ দিয়ে মরবে… তখন কিনা সেটা হয়ে যাবে আমার দোষ! ...আমি জানতে চাইলাম, ঠিক কোথায় খুঁজতে হবে সেটা ও আগে থেকে জানল কী করে? হ্যাঁ, ওই কথাটা একবার গিয়ে জিজ্ঞেস কর দেখি, ওই নাক্কু আজিজকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর!’
সে একটা চিরকুট রেখে গিয়েছিল। তাতে লেখা ছিল: ‘আমি আসলে এমনটা করতে চাইনি।’
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




অসাধারণ!
উত্তরমুছুনদারুণ লাগছে পড়তে। রুশদির ইংরেজির বাংলা করাটাও চ্যালেঞ্জ। ভালো হচ্ছে অনুবাদ।
উত্তরমুছুন